অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে শেষদিনের সংসদ অধিবেশন চলে রাত ৯টার বেশি সময়। সকালের সেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করলেও দুপুরের পরের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের পর স্পিকার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ ২৫ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেমন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য ও সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেছেন, ঠিক তেমনি বিরোধীদলীয় নেতা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংকট ও বাজারের অস্থিরতা নিয়ে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। শীর্ষ দুই নেতার এই তুলনামূলক অবস্থান ও সংসদীয় বিতর্কের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী দর্শন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত হয়েছে।
আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে এই অধিবেশন এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। অধিবেশনে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপিত হয়েছিল, যার বিপরীতে সংসদীয় চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ৯১টি বিল পাশ করা হয় এবং শেষ দিনে আরও ২টিসহ মোট ৯৪টি বিল আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংসদের কার্যকারিতা বাড়াতে ৫টি স্থায়ী কমিটি ও ২টি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক তৎপরতা ও নতুন কমিটিগুলোর সৃষ্টি মূলত সরকারের নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে আরও দায়বদ্ধ করার একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংসদীয় রীতিনীতি ও প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে তৃণমূলের সমস্যা ও সরকারি কাজের স্বচ্ছতা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। কার্যপ্রণালি-বিধির বিভিন্ন ধারায় সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ২০৭ বার দুই মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যসহ অসংখ্য জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে তিনি ৩৫টির উত্তর সরাসরি প্রদান করেছেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাছে জমা পড়া ২৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১৭৭৮টির উত্তর প্রদান করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক এই জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি সদস্যদের অধিকার রক্ষা ও সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে এই অধিবেশনটি একটি সার্থক জাতীয় দর্পণে পরিণত হয়েছে।
বিল পাশের ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের অভাবনীয় তৎপরতা
অধিবেশনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বিল পাশ ও আইন প্রণয়ন কার্যক্রম। এবার সংসদে বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশ ও বিলের আধিক্য দেখা গেছে। মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছিল, যার বিপরীতে সংসদ সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে ৯১টি বিল পাশ করেছেন। সব মিলিয়ে আজ পাশ হওয়া ২টি বিলসহ এই অধিবেশনে মোট ৯৪টি বিল আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। আইন প্রণয়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে কতটা সক্রিয় ছিলেন। প্রতিটি বিলের ওপর আলোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ বিতর্ক হয়েছে যা আইনের গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ
আইন প্রণয়ন কার্যাবলি ছাড়াও সংসদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মজবুত করার লক্ষ্যে এই অধিবেশনে ৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদের কাজকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করার জন্য এই কমিটিগুলো কাজ করবে। এর পাশাপাশি সমসাময়িক বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য ২টি বিশেষ কমিটিও গঠিত হয়েছে। কমিটি গঠন প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কাজের ওপর নজরদারি নিশ্চিত করা হয়। কমিটির সদস্যদের সক্রিয়তা ভবিষ্যতে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কার্যপ্রণালি বিধির আওতায় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাণবন্ত বিতর্ক
সংসদীয় কার্যপ্রণালি-বিধির বিভিন্ন ধারায় সদস্যদের নোটিশ প্রদানের হিড়িক লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ৬২ বিধিতে পাওয়া ১৬টি নোটিশের মধ্যে ২টির ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আবার ৬৮ বিধিতে ৯টি নোটিশ জমা পড়লেও সেগুলোর মধ্য থেকে একটির ওপর সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশ, যার ওপর সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকার সমস্যা ও জাতীয় সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। এছাড়া ৭১ ক বিধিতে ২০৭ জন সদস্য দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা প্রতিটি এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বরকে সংসদের মূল অধিবেশনে তুলে ধরেছে।
বিশেষ অধিকার ও সংসদীয় শৃঙ্খলার প্রতি আলোকপাত
অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে উত্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ১৬৪ বিধিতে মোট ১৪টি নোটিশ পাওয়া গিয়েছিল। সংসদীয় শিষ্টাচার ও সদস্যদের অধিকার রক্ষায় এসব নোটিশের মধ্যে একটি গৃহীত হয়েছে এবং তা যথাযথ তদন্তের জন্য বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ২৬৬ বিধিতে পাওয়া ৩টি নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কার্যক্রমে বিশেষ গতি আনতে ২টি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই সিদ্ধান্তগুলো সংসদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে স্পিকারের অনড় অবস্থানের জানান দেয়।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সরব উপস্থিতি ও তথ্যের জোগান
সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম দিক হচ্ছে প্রশ্নোত্তর পর্ব, যেখানে সরাসরি সরকার প্রধানের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ পান সংসদ সদস্যরা। এই অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য সর্বমোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এই প্রশ্নগুলো গ্রহণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময়ে ৩৫টি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর প্রদান করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই উত্তরদানের মাধ্যমে সরকারের নীতি ও ভিশন সম্পর্কে জাতি একটি পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির চিত্রও তুলে ধরেন।
মন্ত্রণালয় ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর ও জনসেবায় মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতা
প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীদের কাছেও সংসদ সদস্যদের ব্যাপক জিজ্ঞাসা ছিল। মোট ২৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সংসদ সচিবালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, মন্ত্রীরা তাদের দপ্তরের ওপর প্রাপ্ত নোটিশগুলোর মধ্যে ১৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর এই সংসদ অধিবেশনে প্রদান করেছেন। বিপুল সংখ্যক এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্য দিয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও অনেক প্রশ্ন এখনও উত্তরদানের অপেক্ষায় রয়েছে, তবুও এত বিশাল সংখ্যক জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়াকে এবারের সংসদের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি মূলত জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন না হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া ও নির্বাচন ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর ও নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন যে, সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন না হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতেই মূলত তারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করাসহ অনেক বিষয়ে আপস করেছেন। নির্বাচনের স্বার্থে অনেক কথা না বললেও এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের তাগিদ থাকলেও অসাংবিধানিক ও সংবিধানবহির্ভূত আদেশ জারি করায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন যে, ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো গণভোট না হওয়া সত্ত্বেও কোন এখতিয়ারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম তৈরি করা হয়েছে। একে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, জুলাই সনদকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন পন্থায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা মূলত একটি প্রতারণামূলক প্রক্রিয়া যা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদকে অবজ্ঞা করার শামিল।
সালাহউদ্দিন আহমদ তার দীর্ঘ নির্বাসন ও কারাজীবনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে গুম হওয়া নেতাদের পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে, ইলিয়াস আলীর মতো গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্তানদের অশ্রুর মর্যাদা দিতে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এটি সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত। যারা এই বিজয়কে খাটো করতে চান তারা শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব কেউ রাজাকার ছিল না
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সংসদে তার বক্তব্যে নিজেদের দেশপ্রেম ও অতীতের ভূমিকার সপক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি নিজেকে একজন ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করে বলেন যে, যুদ্ধের সময় সীমান্তের কাছাকাছি তাদের বাড়িতে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় ও পথ দেখিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের কেউ রাজাকার বা আলবদর ছিল না দাবি করে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‘তুই রাজাকার’ বলাকে অত্যন্ত অরুচিকর ও অসংগত আচরণ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে সরকারি দলের আসনে থাকা সদস্যরা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই জামায়াতের বিরুদ্ধে একই ধরনের ভাষা ও আচরণ করছেন, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করছে।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সরকারের ভয়ংকর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিএনপিকে সতর্ক করেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়কার ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন যে, ক্ষমতার দাপট যেন কোনো অঘটনের জন্ম না দেয়। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের সাথে জামায়াতের সম্পৃক্ততা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, জামায়াতের নিজস্ব কোনো ব্যাংক নেই এবং বর্তমান এমপিদের কেউ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক বা ঋণ খেলাপি নন। যদিও ব্যাংক পরিচালনায় তাদের ইতিবাচক ভূমিকা আছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
শেষদিন যা বললেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা ও অধিবেশন সমাপ্তি উপলক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দেন। যেখানে তিনি দেশের বর্তমান সংকট, সংসদীয় রীতিনীতি এবং জনগণের আস্থার বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষ যে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল, তা নিরসনে বিরোধী দলের সহযোগিতার প্রস্তাবে সরকার সাড়া দিয়ে কমিটি গঠন করায় জনমনে আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। এই সংকটকে গ্লোবাল ইস্যু হিসেবে অভিহিত করে তিনি জানান, যখন সরকারি ও বিরোধী দল কোনো জাতীয় সমস্যাকে গুরুত্বের সাথে সমাধান করতে একমত হয়, তখন সমাধানের পথ সহজ হয়ে যায় এবং রাস্তার মানুষের কষ্টও লাঘব হয়। তিনি সংসদকে একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাশার ঠিকানা হিসেবে বর্ণনা করে স্পিকার এবং সকল সংসদ সদস্যকে খোলামেলাভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাওয়ার জন্য অভিনন্দন ও শুকরিয়া জানান।
ডা. শফিকুর রহমান তার সাধারণ কৃষক পিতার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হন এবং দেশের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও হাহাকার ভরা অতীতের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও যদি সততা ও দক্ষতার সাথে দেশ পরিচালিত হতো, তবে বাংলাদেশ আরও বহুদূর এগিয়ে যেত। অন্যের দোষ খোঁজার চেয়ে নিজের ভুল সংশোধন করাই মহৎ মানুষের কাজ উল্লেখ করে তিনি সংসদকে কেবল ইতিহাস চর্চার কেন্দ্র না বানিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি দেশের শিশু, শ্রমিক, ছাত্র ও কৃষকদের না বলা যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে বলেন, কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লুটতরাজে তারা নিঃস্ব হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা পাড়ের মানুষের নদী ভাঙন ও পানির অভাবজনিত করুণ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান এবং বলেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কারো চোখ রাঙানিকে পরোয়া করা হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা তার নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা মিরপুর ও কাফরুলের অবকাঠামোগত নানা সমস্যা যেমন, জরাজীর্ণ রাস্তা, যানজট, জলাবদ্ধতা এবং পানির হাহাকারের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ৫ আগস্টের পর যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছি সেখানে কিশোর গ্যাং, মাদক এবং চাঁদাবাজির কোনো স্থান নেই। চাঁদাবাজ যে দলেরই হোক তাকে নির্মূল করার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি দাবি করেন, ১ ভাগ মানুষের হাতে যেন ৯৯ ভাগ মানুষ জিম্মি না থাকে। এছাড়া তিনি শিক্ষাঙ্গণকে সন্ত্রাসমুক্ত করে মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেন। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদের সময় বঞ্চিত ও ওএসডি হওয়া মেধাবী চিকিৎসকদের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী না হয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুসৃত স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের অনেক বন্ধুর প্রয়োজন আছে কিন্তু কোনো প্রভুর দরকার নেই। বিচার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন যে, বিগত সময়ে সংঘটিত সকল হত্যা, গুম ও ধর্ষণের বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে করতে হবে যাতে কেউ একে প্রতিহিংসার রাজনীতি বলতে না পারে। ফ্যাসিস্টদের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হতে হবে এবং এই প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। যদি আপস করা হয় তবে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না।
ডা. শফিকুর রহমান রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচালিত অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন এবং বলেন যে, এ ধরনের নোংরামি বন্ধ করতে টেকনোলজি ব্যবহার করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, দলমত নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে আমরা যদি এক হতে পারি তবে কোনো অপশক্তিই আমাদের সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না। তিনি অধিবেশন সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এক মাসের বিশেষ ইনসেন্টিভ প্রদানেরও অনুরোধ জানান।
জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও শহীদদের আত্মত্যাগই সরকারের পথচলার শক্তি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে দেওয়া এক নীতিনির্ধারণী ও আবেগঘন বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টতার সাথে উল্লেখ করে জানান, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি প্রশাসন, যার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের প্রতিটি সমস্যা লাঘব করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংসদীয় গণতন্ত্রের গুরুত্বারোপ করে বলেন, আজকের এই সংসদ শুধু একটি ভবন নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের ছড়িয়ে থাকা কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশার ঠিকানা। শহীদদের প্রতি কেবল শ্রদ্ধা নিবেদনই যথেষ্ট নয়, বরং যে লক্ষ্য নিয়ে মানুষ রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যেখানে মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই সরকারের আসল লক্ষ্য।
সরকার প্রধান হিসেবে নিজের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এক অনন্য অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দূর থেকে সরকার প্রধানের চেয়ারটি আরামদায়ক মনে হলেও আসলে এটি মোটেও সুখকর নয়; বরং এই চেয়ারে বসলে তিনি প্রতি মুহূর্তে আগুনের তপ্ত উত্তাপ অনুভব করেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে জনপ্রিয় কথা বলে হাততালি কুড়ানোর সুযোগ থাকলেও এই দায়িত্বের জায়গাটি তাকে সর্বদা জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের বদলে সঠিক বা ‘রাইট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দেয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল সাময়িক বাহবা পাওয়ার জন্য ভুল পথে হাঁটলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেই সরকার প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে পানির স্তর সুরক্ষা ও কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর শুভফল পেতে হয়ত সময় লাগবে, কিন্তু আগামীর প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।
কৃষি ও শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হয়েছে যা মৎস্য ও গবাদি পশু পালনকারীসহ সকল পর্যায়ের কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে তিনি বলেন, আগামী জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ, ড্রেস এবং জুতার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার ঘোষণা দিয়ে তিনি একে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করেন। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি ভবন নির্মাণের চেয়ে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও যন্ত্রপাতির নিশ্চয়তা প্রদানের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন।
দেশের সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে দুর্গত মানুষের তালিকা তৈরি করে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতীতে হরতাল ও অস্থিতিশীলতার কারণে দেশ ও অর্থনীতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার মাসুল আজও জাতিকে টানতে হচ্ছে। বর্তমানে ৩০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি একটি স্থিতিশীল সংসদ ও সরকার ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। তিনি আবারও বিরোধী দলের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করে জানান, তাদের জন্য ডেপুটি স্পিকারের পদটি এখনো উন্মুক্ত এবং তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিরোধীদলের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেন, বর্তমান সংসদ এবং বাংলাদেশ হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা একে অপরকে ব্যর্থ করার প্রতিযোগিতায় না নেমে একসাথে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। সরকার এবং বিরোধী দল একে অপরের পরিপূরক এবং কেউ একজন ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে। সংসদীয় কার্যক্রম সফল করতে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সকল সংসদ সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকল সেবা প্রদানকারী সংস্থাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশেষ করে ফ্যাসিবাদের পলায়ন পরবর্তী সময়ে দেশে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার উচ্চকিত প্রশংসা করেন এবং সব সংসদ সদস্যকে সবুজ চেয়ারের পবিত্রতা রক্ষা করে দেশ ও জনগণের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা