অনলাইন ডেস্ক
লোহিত সাগর উপকূল ধরে চলতি সপ্তাহে হুথিদের অগ্রসর হওয়া এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান প্রণালীর মুখে অবস্থিত দ্বীপগুলো দখল করে নেওয়া রিয়াদকে সমর্থন খোঁজার জন্য দিশাহারা অবস্থায় ফেলে দিয়েছে; যেখানে ইরান ও তার মিত্রদের প্রভাব কেবল বাড়ছেই।
পশ্চিমা, আঞ্চলিক ও ইয়েমেনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সূত্র বলেছে, হুথিদের এই সাফল্য বিভিন্ন বিষয়েরই প্রতিফলন। হুথি-বিরোধী ইয়েমেনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর দলাদলি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের তত্ত্বাবধানের পরিবর্তে সৌদির অনভিজ্ঞ কমান্ড কাঠামো, সৌদি আরবের সীমিত বিমান সহায়তা এবং হুথিদের প্রস্তুতির বিষয়টি হেলাফেলা করায় হুথিরা এই সাফল্য পাচ্ছে।
এক কূটনীতিক বলেন, হুথিরা গোপনে প্রায় ১ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত করেছিল; যা প্রতিপক্ষের সৈন্যদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, সৌদিসহ সবাই এই সৈন্য সমাবেশের বিষয়টি খেয়াল করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং হুথিদের মনোভাবের বিষয়ে অনুমানে ভুল করেছে।
লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউসের ফেলো নিল কুইলিয়াম এই অভিযানকে একটি চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘‘তারা স্রেফ কোনো সংকেত ধরতে পারছিল না। তারা কোনো লক্ষণই দেখতে পাচ্ছিল না।’’
ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফারিয়া আল-মুসলিমী বলেন, ‘‘ইয়েমেনে সৌদি আরব একেবারেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা খেয়েছে।’’
সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর এই পতন ভূখণ্ড ছাড়া হুথিদের হাতে আরও একটি বড় পুরস্কার তুলে দিয়েছে। আর সেটি হলো পিছু হটার সময় ফেলে যাওয়া মার্কিন ও সৌদি আরব থেকে সরবরাহ করা বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্রশস্ত্র।
আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র বলেছে, অস্ত্রের এই বড় চালান হুথিদের সামরিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে, প্রতিপক্ষের সামরিক সরঞ্জামের ওপর মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য দেবে এবং সৌদির অবমাননাকর পরাজয়ের দৃশ্যপটকে আরও জোরালো করে তুলবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘ইয়েমেন সরকারের বাহিনী ছিল তাসের ঘরের মতো। তারা কোনো প্রতিরোধই করেনি। একেবারেই না। পুরোপুরি অকার্যকর।’’
এই বিপর্যয় একটি পাল্টা আক্রমণের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থনের বিষয়টি কতটা সীমিত, তাও উন্মোচিত করেছে। দু’জন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় দেশগুলোর কেউই সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত ছিল না। এমনকি ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা জুলাইয় ঘোষিত সৌদি-নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটেও যোগ দেয়নি।
তবে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সৌদি কর্মকর্তারা কোনো সাড়া দেননি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা বর্তমানে এমন ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে; যা সৌদি তেলের রপ্তানি এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানানোর পর এর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সাহায্য চাইতে কায়রো গেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)।
দুটি আঞ্চলিক সূত্র বলেছে, লোহিত সাগরের অভিযানে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল রিয়াদ; যা ২০১৫ সালে কায়রোর সেই হস্তক্ষেপের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী বাব আল-মানদেব সুরক্ষায় সাহায্য করেছিল। তবে কায়রো এতে সম্মত হবে কি না সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
এমবিএস মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন কি না জানতে চাওয়া হলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। হুথিরাও তাদের এই সাফল্যকে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন মধ্যস্থতাকারী ডেনিস রস বলেন, এই গোষ্ঠীটি রিয়াদের কাছে হুদাইদাহ বন্দর ও সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি সমর্থন কমিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে।
রস বলেন, আমি মনে করি না সৌদিরা সহজে তাদের এই ধরনের দাবির কাছে মাথা নত করতে পারবে।
উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব বর্তমানে সীমিত কিছু পছন্দের মুখোমুখি হয়েছে। হুথিদের এই লাভ ধরে রাখার সুযোগ দিলে তা কৌশলগত বিজয়কে স্থায়ী ভৌগোলিক সুবিধায় পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে বড় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া রাজতন্ত্রের আরও গভীরে হামলার কারণ হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, আপনি যদি হুথিদের পর্যাপ্ত আঘাত না হানেন, তাহলে আপনাকে তাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।
আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন এবং আফ্রিকা উপকূলের জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালীর চারপাশের ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের আঞ্চলিক প্রভাবকে আরও গভীর করতে পারে; যা তাদের রসদ ও চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলকে সহজেই নাগালের মধ্যে এনে দেবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাবের সাথে যুক্ত হয়ে এই অবস্থান তেহরান ও তার মিত্রদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পয়েন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।
এমবিএসের কূটনৈতিক কৌশল; যা ইরানের সাথে দূরত্ব কমিয়ে অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল—মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভেস্তে গেছে। এর ফলে রিয়াদের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা মারাত্মক চাপে পড়েছে, যা রাজতন্ত্রের এই ডি-ফ্যাক্টো শাসকের ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলছে।
ইয়েমেনে পশ্চিমা সামরিক সহায়তার অনুপস্থিতি এবং নবগঠিত প্রতিরক্ষা জোটে এই শক্তিগুলোর অনুপস্থিতি সৌদির চরম সংকটের মুহূর্তে সমর্থন পাওয়ার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরেছে। এতে রিয়াদ ক্রমেই তার প্রতিপক্ষের কাছে কৌশলে হেরে গেছে এবং মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাহায্য পায়নি বলে মনে হচ্ছে।
হুথিদের আক্রমণ সৌদি এবং মার্কিন কৌশলের একটি দুর্বল দিক উন্মোচিত করেছে। ওয়াশিংটন এবং তার মিত্ররা যখন ইরানকে সরাসরি ঠেকানোর দিকে নজর দিয়েছিল, তেহরান তখন জ্বালানি সম্পদ, সমুদ্রপথ এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ইরাক থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত নতুন ফ্রন্ট খুলে যুদ্ধের ময়দানকে আরও প্রশস্ত করেছে।
হুথিদের এই সাফল্যের বড় তাৎপর্য কেবল সৌদি আরবের ওপর ধাক্কার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গাজা, সিরিয়া এবং লেবাননে তাদের মিত্রদের বড় বিপর্যয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাবকে পুনরায় চাঙ্গা করার মধ্যেও রয়েছে।
ফারিয়া আল-মুসলিমী বলেন, ইরানের জন্য এটি একটি ‘সব দিকের জয়।’
কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিপর্যয়ের চেয়েও বড় ধাক্কা হলো তার মিত্রকে রক্ষা করতে ওয়াশিংটনের অনিচ্ছা। তারা বলছেন, এই সংকেত শত্রুদের উৎসাহিত, রিয়াদের দরকষাকষির ক্ষমতা দুর্বল এবং মার্কিন নিরাপত্তার নিশ্চয়তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহকে আরও বাড়িয়েছে।
সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় ওয়াশিংটনের সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানানোকে আল-মুসলিমী গত কয়েক দশকের মধ্যে সৌদি-আমেরিকান সমঝোতার সবচেয়ে বড় প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, আমেরিকানরা এখন না বলছে। রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কের এই ধরনের বোঝাপড়া এর আগে আর কখনোই এত বড় পরীক্ষার মুখে পড়েনি।
১৯৬০-এর দশকে মিসর থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব; বিদেশি শক্তিগুলোকে পরাজিত করার ইয়েমেনের দীর্ঘ ইতিহাস ব্যাখ্যা করে কেন রিয়াদের অংশীদার খোঁজার এই চেষ্টা কেবল সীমিত ফল দিতে পারে।
খুব কম আঞ্চলিক শক্তিই এমন এক সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে উৎসুক বলে মনে হচ্ছে; যা বারবার বাইরের হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ এবং বিদেশি সামরিক আকাঙ্ক্ষার কবরস্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
যেসব যুদ্ধে বিদেশি শক্তিগুলো লাঞ্ছিত হয়েছিল সেসবের উল্লেখ করে মুসলিমী বলেন, ইয়েমেন হলো তাকে আকর্ষণ করা প্রতিটি পরাশক্তির জন্য ভিয়েতনাম এবং আফগানিস্তান। মিসরের ১৯৬০-এর দশকের ব্যয়বহুল হস্তক্ষেপের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সৌদিরা ইয়েমেনে ব্যর্থ হয়েছে, আমেরিকানরা ইয়েমেনে ব্যর্থ হয়েছে, মিসরীয়রাও ইয়েমেনে ব্যর্থ হয়েছিল।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা