ফজলুল বারী : দেশ থেকে উদ্বিগ্ন লোকজন সারাক্ষন জানতে চায় বিদেশে আমরা কেমন আছি। তাদের একটাই জবাব দেই, আমরাতো এখানে অনেক সতর্ক, কিন্তু টেলিভিশনে আপনাদের দেখলে ভয় করে ভাই। বিদেশে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি আইনের কড়াকড়ির কারনেও বাধ্যতামূলক আইন মেনে চলতে হয়। আর দেশের নানা ছবি দেখে মনে হয় সবকিছু কত ক্যাজুয়াল! ছুটি পেয়ে সবাই হৈ হল্লা করে বাড়ি চলে গেলেন! এখনও অনেকে মালবাহী ট্রাকে করে যাচ্ছেন! এম্বুলেন্সে যাচ্ছেন! একেকজনের মুখে দারুন সব বাহারি মাস্ক! ঈদের সময় যেমন নানা ভোগান্তি, বেশি দামের টিকেটে নানান বাহারি পোশাক পরে বাড়ি যান, এবার সবার সঙ্গে বাড়তি একটি বাহারি মাস্কও ছিল। ঈদের কেনাকাটার মত করে অনেকে হয়তো বাড়ির সবার জন্যে মাস্ক কিনেও নিয়ে গেছেন।
কিন্তু যে গাদাগাদি অবস্থায় গেছেন সেখানেই ঝুঁকিটা সঙ্গে নিয়ে গেছেন। কারন করোনাকে যদি ভয়ই করেন, এটি কিন্তু এক ধরনের ভাইরাল মরণঘাতী জ্বরের নাম। ফ্লু’র মতো এটি বাতাসে ভাসছে। যে এলাকায় একজন রোগী আছে ভাইরাল জ্বরটি সুবিধামতো সেটি সে এলাকার যে কাউকে রিসিভ করছে। রোগের জীবানুটি যেখান গিয়ে পড়েছে সেটি সক্রিয় হয়ে উঠছে, রিসিভ করছে মানুষের স্পর্শ পেলেই। এরজন্যেই বারবার হাত ধোয়ার কথা বলা হয়েছে। এখন যে ঝুঁকি নিয়ে একেকজন বাড়ি গেছেন ফেরার সময়ও একই ঝুঁকিতে ফিরবেন! তখন বরং ঝুঁকিটা অনেক বাড়বে। কারন ততোক্ষনে রোগটি নিয়ে আমেরিকা থেকে অনেক দেশি ফিরবেন বাংলাদেশে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকির খবরটি হচ্ছে বিলাত থেকে একের পর এক ফ্লাইট আসছে! এটা কী সিলেটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর কারনে? এখন আমেরিকা হয়ে উঠেছে করোনার এপিক সেন্টার। আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের ডাইরেক্ট কোন ফ্লাইট নেই। আমেরিকা থেকে এখন যারা আসছেন তারা বিভিন্ন ভাবে বিলাত থেকে যে সব ফ্লাইট আসছে সেগুলোর কানেক্টিভিটি ধরে আসছেন দেশে। সঙ্গে নিয়ে আসছেন মহামারী রোগটি দেশে ছড়িয়ে ধরার ঝুঁকি।
বাংলাদেশের হোম কোয়ারিন্টানের প্রয়োগ ব্যর্থ হয়েছে। কারন বেশিরভাগ লোক তা মানছেননা। এভাবে রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন পরিবারে। এই প্রবাসী আগে দেশে ফেরার সময় স্বজনের জন্যে টাকা, নতুন কাপড় নিয়ে আসতেন। এখন তারা মৃত্যুও নিয়ে আসছেন। হোম কোয়ারিন্টানকে আরও কড়াকড়ি করতে অস্ট্রেলিয়া শুক্রবার নতুন একটি নীতিমালা ঘোষনা করেছে। এই নীতিমালা হলো এখন যারা বিদেশ থেকে আসছেন তাদেরকে বাধ্যতামূলক কোন হোটেল অথবা অন্য কোন আবাসন ব্যবস্থায় কোয়ারিন্টানে থাকতে হবে দু’সপ্তাহ। এরপর তারা বাড়ি যেতে পারবেন। বাংলাদেশ সরকারও একই কড়াকড়ির ব্যবস্থা করতে পারে।
আর আমেরিকা-ব্রিটেন থেকে যারা আসছেন তাদের দু’সপ্তাহ হোটেলে থাকার সামর্থ্য আছে। সরকারকে বলবো প্লিজ দ্রুত সিদ্ধান্তটি নিন। যেহেতু আমেরিকা এখন মহামারী রোগটির মূল এপিক সেন্টার। আর হজ ক্যাম্প থেকে ইতালি ফেরতরা যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তেমন আবার ঘটলে সামনে কিন্তু সমূহ বিপদ। শুধু বিদেশ থেকে আসা আইন না মানা লোক নয়, দেশের লোকজনও ভয়াবহ রোগটা সম্পর্কে কতোটা ক্যাজুয়াল তা ফুটে উঠছে বিভিন্ন টেলিভিশনের রিপোর্টে। ঢাকার শহীদবাগ এলাকার কিছু যুবক এক টিভির প্রতিবেদককে বলছিলেন কতোক্ষন আর বাসায় থাকতে ভালো লাগে। এরজন্যে তারা বেরিয়েছে! আরেচ যুবক বলছিলেন, বাসায় থাকার চাইতে মসজিদে থাকা ভালো। মাঝে মাঝে হুজুরের বয়ানও শোনা যায়! কি ভয়ংকর চিন্তাভাবনা!
অথচ মহামারী আতঙ্কে সৌদি আরবেরও সব মসজিদ বন্ধ করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ওমরাহ হজ। আর বাংলাদেশে মসজিদ বন্ধ করা যাচ্ছেনা! এক টেলিভিশনের রিপোর্টে বলা হচ্ছিল সীমিত আকারে জুম্মার নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে! যেখানে সৌদি আরবেরও মক্কা-মদিনার প্রধান দুটি মসজিদও এখন বন্ধ, মিসরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় এখন ইসলামের সর্বোচ্চ পড়াশুনা-গবেষনার প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এসেছে। আর বাংলাদেশে বলা হচ্ছে সীমিত আকারের জুম্মা! অস্ট্রেলিয়ার মুসলমানদের অবশ্য এসব নিয়ে জারিজুরি করার সময় নেই। সুযোগও নেই। এখানে ইনডোরে একশর কম সমাবেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আসার পর মসজিদ-গির্জা সব বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষ পরিস্থিতির কারনে সবাই যার যার বাড়িতে নামাজ পড়ছেন। এতে তাদের ধর্ম খারিজ হয়ে যাবেনা। এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া সরকার বলেছে, মৃতের সৎকারেও দশজনের বেশি লোক উপস্থিত থাকতে পারবেনা। যে যেখানে দাঁড়াচ্ছেন তাদের মানতে হচ্ছে সোশ্যাল ডিসটেন্স তথা সামাজিক দূরত্বের সরকারি নির্দেশনা। পুলিশ এখানে সরকারের নানান জরিমানা আদায় করে। করোনা পরিস্থিতিও পুলিশকে নতুন অনেক কাজ দিয়েছে। কেউ কোথাও সামাজিক দূরত্ব না মানলে তাকে স্পট ফাইন করা হচ্ছে হাজার ডলার। এভাবে এখানে সবাইকে করোনা সতর্কতার মেনে চলতেই হচ্ছে। প্রথম কারন এখানে প্রায় সবাই শতভাগ শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্য সচেতন, দ্বিতীয়ত জরিমানা। এসবের চাইতে বেশি উদ্বেগ কাজ করছে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। কারন গত কয়েকদিনে কয়েক লক্ষ লোক এখানে চাকরি হারিয়েছেন।
বাংলাদেশী এক কর্মঠ যুবক ফেরদৌস। সিডনির হারবার লাগোয়া বিখ্যাত একটি রেষ্টুরেন্টের অন্যতম ম্যানেজার। আমার অনুরোধে বাংলাদেশি অনেক ছাত্রকে কাজ দিয়েছেন ফেরদৌস। শুক্রবার ফোন করতেই জানা গেলো ফেরদৌস বাসায় রান্না করছেন। তাঁর রেষ্টুরেন্ট যেটি দিনে রাতে চব্বিশ ঘন্টা চালু থাকতো সেই রেষ্টুরেন্ট এখন বন্ধ। করোনা পরিস্থিতির কারনে অস্ট্রেলিয়া সরকার এরমাঝে দেশের সব রেষ্টুরেন্টে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে। ফেরদৌসের রেষ্টুরেন্টে টেইকওয়ে সার্ভিস চালু করা হলেও সেটিও চলেনি। এমন অবস্থা কতোদিন চলবে, বার্ষিক ছুটির বাইরে কতোদিন কর্তৃপক্ষ তাকে বেতন দিতে পারবে এর কিছুই ফেরদৌস এখনও জানেননা। অস্ট্রেলিয়ার সাজানো অর্থনীতির নানাকিছু এমন লন্ডভন্ড করে দিয়েছে করোনা পরিস্থিতি।
করোনা পরিসংখ্যান এর লাইভ আপডেট দেখুন
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা