অনলাইন ডেস্ক
তিনি সোমবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ইউসুফ কালুর ছেলে ওবায়দুর রহমান সোহাগ তার মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মঙ্গলবার সকাল ১০টায় এসসিজিএম বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ইউসুফ কালুর মরদেহ রাখা হয়। এখানে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। এরপর জানাজা শেষে তার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার কানুদাসকাঠি গ্রামের মিঞা বাড়িতে তাকে দাফন করা হবে।
ইউসুফ কালু ছিলেন জীবন্ত ইতিহাস। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভাষাসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তার জন্ম ১৯৩১ সালের ১৭ জানুয়ারি ঝালকাঠির রাজাপুরের কানুদাসকাঠির মিয়া বাড়িতে। বাবা ওবায়দুল করিম (রাজা মিয়া) ও মা ফাতেমা খাতুন।
তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা ওবায়দুল করিম প্রথমে ১৯২০ সালে কলকাতা পোর্ট কমিশনে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে রাজা রায় বিহারির জমিদারির নায়েব নিযুক্ত হন। আমুয়া, ভাণ্ডারিয়া, কানুদাসকাঠি অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ইউসুফ কালুর হাতেখড়ি পাঠশালায়। সংগঠন শুরু শিশু কিশোরদের মুকুল ফৌজ দিয়ে। ১৯৪৮ সালে বরিশাল বিএম স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নত অবস্থায় বাংলা ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন কালু। প্রগ্রেসিভ ছাত্রফ্রন্টের নেতা এমায়দুলের নেতৃত্বে মিছিলে যোগ দিয়ে প্রথম দিনই পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন। এরপর মেট্রিকুলেশন পাস করে ১৯৫১ সালে বিএম কলেজে এইচএসসিতে (কমার্সে) ভর্তি হন। তখন থেকে ভাষা সংগ্রামে তার সম্পৃক্ততা আরও বেড়ে যায়।
তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) সৈয়দ গোলাম কিবরিয়াকে আহ্বায়ক করে বিএম কলেজে গঠন হয় ২৫ সদস্যের ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সেই কমিটির সদস্য হন ইউসুফ কালু। আন্দোলনের গতি বাড়লে সেই কমিটির কলেবর বৃদ্ধি করে ৮১ সদস্য বিশিষ্ট বৃহত্তর বরিশাল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ করা হয়।
১৯৫৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বরিশালে প্রচারণায় আসেন তৎকালীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান আব্দুল কাইউম। কাইউমকে ঠেকাতে কালো পতাকা মিছিলসহ আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নেন কালু। ওই মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কাউনিয়ার বাসিন্দা মালেক নামে একজন নিহত হন। ইউসুফ কালুসহ ৩৫ জন গ্রেফতার হন। ২২ দিন পর জামিন পেয়ে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের হয়ে কাজ শুরু করেন।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলনেই দেশ ও মানুষের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধও করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে কলকাতা লালবাজারে বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির সহযোগিতায় হাসনাবাদ, হিংগলগড়, টাকি হেডকোয়ার্টার্সে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন নুরুল আলম ফরিদ সম্পাদিত রণাঙ্গনের মুখপত্র ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ পত্রিকার পরিচালকদের একজন ছিলেন। ৭১ সালে তার বাড়ি লুট হয়। তখন দলিলপত্র, ব্যক্তিগত কাগজপত্র সব কিছু খোয়া যায়। শিক্ষা জীবনের প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন তিনি। ১৯৫২ সালে যোগ দেন ছাত্রলীগে। পরে জড়িয়ে পড়েন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে।
তিনি স্বৈরাচারবিরোধী ও প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন। প্রথমে আজাদ ও পরে দৈনিক পয়গামের বরিশাল সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করেছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত। ওই একই সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলায় পারদর্শী তিনি বরিশাল ক্রীড়া সংস্থারও সদস্য ছিলেন।
ভাষা সৈনিক ইউসুফ কালুর মৃত্যুতে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার, শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং তার শোক-সন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা