অনলাইন ডেস্ক
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে মূলত তিন বছর মেয়াদে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে তা টেনে নেওয়া হয়েছে ১৬ বছর পর্যন্ত। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা। এত দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকার এই জলাশয় দূষণমুক্ত হয়নি।
এছাড়া প্রকল্পটির বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে যেসব অডিট আপত্তি তোলা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। রাজউক ও সিটি কপোর্রেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এর মূল কারণ।
এর ফলে একদিকে জলাশয়গুলোর দূষণ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী এসব এলাকার প্রায় ৬৪ শতাংশ ভবনে সেপটিক ট্যাংকের কোনো অস্তিত্বই নেই। গুলশান-বনানী এলাকায় রাজউকের তত্ত্বাবধানে থাকা ভবনগুলোর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করতে ১০টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছিল। টিমগুলো ওই অঞ্চলের মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন পরিদর্শন করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শন করা ভবনগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৮২২টিতে সেপটিক ট্যাংক নেই। অন্যদিকে, সেপটিক ট্যাংক পাওয়া গেছে মাত্র ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে। শোষক কূপ (সোকওয়েল) নিয়ে করা জরিপে দেখা গেছে, এলাকার ৯২ দশমিক ২৭ শতাংশ ভবন, অর্থাৎ ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে শোষক কূপের কোনো ব্যবস্থা নেই। আর মাত্র ২৯৪টি ভবনে শোষক কূপের সুবিধা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, পরিবেশগত উন্নয়নকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকে কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করা হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং দুর্গন্ধযুক্ত ও আবর্জনায় ভরা নোংরা পানি লেক ও তার আশপাশের পরিবেশকে দূষিত করে তুলেছে।
প্রকল্পটি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল এই লেকের অন্তত সাতটি স্থানে সরাসরি সুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের সংযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ওয়াসার আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লেকের মাত্র প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ (আঠালো বর্জ্য), পলি ও অন্যান্য বর্জ্য সরানো হয়েছে। সেগুলো ঢাকার বাইরে পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু লেকের একটি বড় অংশে এখনো প্রচুর পলি ও বর্জ্য জমে আছে। এ কারণে ভবিষ্যতে লেকের পানি ধারণক্ষমতা আবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার পুনর্ভরণের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার সংযোগ নেই এমন এলাকায় প্রতিটি ভবনে মানসম্পন্ন সেপটিক ট্যাংক অথবা সমমানের অনুমোদিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কোনো ভবন এই বিধান লঙ্ঘন করে নির্মিত বা ব্যবহৃত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।
গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই মাসে। প্রথম দফায় এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে ২০২৫ সালে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পের শুরুতে অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপর কয়েক দফা মেয়াদ বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ ও নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৭ মে প্রথম সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় আরও অনেক বেশি টাকা।
গুলশান লেকের পাশের একটি বাড়ির মালিক খোরশেদ আলম বলেন, গুলশান, বারিধারা, বনানী এসব অভিজাত এলাকা। এসব এলাকার বাড়িগুলোতেই যদি সেপটি ট্যাংক না থাকে তাহলে কিভাবে অভিজাত এলাকা হলো। আমরা যারা সেফটি ট্যাংক করেছি তারও কেন এসব দুর্নামের ভাগিদার হবো? যারা করেনি বা এখনও উদ্যোগ নিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে আসলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা চাই লেকের উন্নয়ন হোক, দারুণ পরিবেশ থাকুক। সে জন্য যা যা করার প্রয়োজন তা গ্রহণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
সম্প্রতি ‘স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এ বিষয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানি যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব? কীভাবে এসব এলাকার পরিবেশ ঠিক করা যায়, তা নিয়ে কাজ হচ্ছে। গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর আছে। এর মধ্যে বোধহয় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবনে নিয়ম অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক বা সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) থাকার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, গুলশান লেকসহ আশপাশের জলাশয় দূষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভবনে যথাযথভাবে সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল ও এসটিপি স্থাপন অপরিহার্য। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজউকের আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী এসব অবকাঠামো স্থাপন বাধ্যতামূলক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো পরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকায় সেপটিক ট্যাংক বা শোষককূপ (সোকওয়েল) না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রচলিত ইমারত ও পরিবেশ আইনে এটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণেই এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হয়েছে। টেকসই সমাধানের জন্য ভবনমালিকদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক নির্মাণে বাধ্য করতে হবে। যারা এতে ব্যর্থ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা