অনলাইন ডেস্ক
১৮৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এককালের কর্মচারী স্যার এ্যাসলে ইডেন (Sir Eshley Eden) বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে তৎকালীন বাংলার শাসক ব্রিটিশ সরকারের একজন সচিব হিসাবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্ব পালন শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (বাংলা সহ) গভর্নর নিযুক্ত হন এই স্যার এ্যাসলে ইডেন। দীর্ঘ সাত বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের শেষ দিকে ১৮৮৭ সালে দুটি বালিকা বিদ্যালয়ের সমন্বয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি গার্লস স্কুল। স্যার এ্যাসলে ইডেনের নামানুসারে এই স্কুলের নামকরণ করা হয় ইডেন গার্লস স্কুল। ১৯২৬ সালে কলেজ শাখা চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ইডেন গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ। ১৯৫৮ সালে কলেজ সেকশন আলাদা হওয়ার কারণে নতুন নাম হয় ইডেন মহিলা কলেজ। ১৯৬২ সালে আজিমপুর ১৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ইডেন মহিলা কলেজ।
ইতিহাস মতে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা সিকিম দখলের পর রাজনৈতিক সমঝোতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্যার এ্যাসলে ইডেন কে। তুমলং চুক্তি সম্পন্ন করে সিকিমের রাজা সিদকেয়ং নামগয়ালকে ( Sidkeyong Namgyal) তিনি বশে আনেন। সিকিম দিয়ে চলাচলকারী সকল যাত্রী ও বাণিজ্যিক বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছিলেন ইডেন । এই সাফল্যে উজ্জীবিত স্যার এ্য।সলে ইডেন কে ১৮৬৩ সালে ভুটানে পাঠানো হয় অনুরূপ সমঝোতার জন্য। অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী ইডেন এই যাত্রায় কোন সৈন্য বাহিনী ছাড়াই ভুটান যান এবং তার কারিশমা প্রয়োগের চেষ্টা চালান । কিন্তু এবার বিধি বাম। এক্ষেত্রে ভুটানের স্থানীয় জনগণ তাকে কেবল বর্জন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বাহারি চুল ধরে টানাটানি করে এবং মুখে কাঁচা গোবর মেখে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরে ১৮৬৪ সালের নভেম্বরে “ডুরাণ যুদ্ধ” শুরু হয়, যা চলে এক বছর পর্যন্ত। এতে শেষ বিচারে বৃটিশদেরই জয় হয়।
ঢাকাস্থ ইডেন মহিলা কলেজের রাজনৈতিক নেত্রী নামের কতিপয় বিপথগামী ছাত্রী পৌরাণিক ধর্মে বর্ণিত স্বর্গীয় বাগান ইডেন কিংবা ব্রিটিশ বার্মার গভর্নর ইডেনের ইতিহাস কতটুকু জানেন, তা বলার সাধ্য নেই। তবে যা টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখেছি, তা থেকে বুঝা যায় ভুটানের মানুষ ১৮৬৩ সালে যেভাবে স্যার এ্যাসলে ইডেনের চুল টেনে ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সাথে নিজের সহপাঠী কিংবা ছোট বোন তুল্য অন্য ছাত্রীদের চুল টানায় পরাঙ্গম এ যুগের ইডেন মহিলা কলেজের কতিপয় ছাত্রী। যেভাবে ভুটানের মানুষ স্যার ইডেনের মুখে গোবর লেপ্টে দিয়েছিল, ১৫৯ বছর পরে তেমনি করে ছাত্র রাজনীতির গৌরবজ্জ্বল অবয়বে কলঙ্কের চুনকালি লেপ্টে দিয়েছে এই ছাত্রী নামের দস্যুরা। চাঁদাবাজি, সিট বাণিজ্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বন্দী করে রাখা,আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল, রাজনীতির নামে নিজেদের শোডাউনে যেতে বাধ্য করা সর্বোপরি নেতাদের বাড়িতে ছাত্রীদের পাঠানোর অভিযোগ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইডেন কলেজে বেশ ক’দিন ধরেই চলছিল এমন অনাচার। ২০১৪ সালের ২৪শে জুন রাতে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল চলবে না হিন্দি সিরিয়াল চলবে, এ নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক শাখার সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের দুটি দল সংঘর্ষে জড়ায়। সিট দখল, উচ্ছেদ এবং পাল্টা দখলের ঘটনা নৈমত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়ে ছিল বিগত কিছুদিন যাবত। চলমান এই দ্বন্দ চরমে উঠে গত ২৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার। ঐদিন আবার ছিল বিশ্ব কন্যা দিবস। পুরুষ শাসিত সমাজে কন্যাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা এবং তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকু নিশ্চিত করাই বিশ্ব কন্যা দিবসের প্রতিপাদ্য। আইয়েমে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগে সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো বাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে। কন্যা সন্তান প্রসবের জন্য অনেক মা’র সংসার ভেঙে যেত বা অপয়া অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। যৌতুকের অভিশাপ আজও বিরাজ করছে এই সমাজে। এই উপমহাদেশে গর্ভের সন্তান যদি কন্যা হয়, তবে ক্লিনিকের দালালরা বলে, ৬০০০ টাকা খরচ করে গর্ভপাত ঘটাও, কন্যা বিয়ে দেওয়ার ৬ লাখ টাকা বাঁচবে। পথে – ঘাটে, যানবাহনে ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের ও নীরব দহনের শিকার হয়। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২৫ সেপ্টেম্বর অন্ততঃ বিশ্ব কন্যা দিবসে কন্যার বাবারা একটু বাড়তি স্নেহে ভাসিয়ে দিতে চায় কন্যাদের। সেই বাবারা আজ আতঙ্কে ভুগছে একদল কন্যার প্রতি আরেক দল কন্যার এমন হিংস্র আয়োজনে। পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থে কন্যা বা মেয়েদের প্রতি সহনশীল, শ্রদ্ধাশীল এবং বন্ধু বৎসর হওয়ার তাগিদ রয়েছে। আজ প্রশ্ন জাগে, এই তাগিদ কি কেবল পুরুষদের প্রতি? ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ঈশ্বর একজন কন্যাকে তার ঘরেই পাঠায়, যার একজন চিরজীবনের বন্ধু প্রয়োজন। একজন কন্যার বাবা হিসেবে বলবো, টেলিভিশনের পর্দায় খোদ রাজধানীর এক ঐতিহ্যমন্ডিত মহিলা কলেজে মেয়েদের উপর নেত্রী নামের দস্যুদের এই আচরণ ক্ষমার অযোগ্য।
সবচেয়ে অবাক লাগে এক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা দেখে। দেশের শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ছাত্র রাজনীতি নামে দস্যুপনার প্রভাব কতটা প্রবল, ইডেন কলেজের ঘটনা যেন তারই প্রমাণ। হঠাৎ করেই যে ইডেন কলেজে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এমন বিস্ফোরণূন্মুখ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল ইডেন কলেজে। অথচ প্রশাসন ছিল নির্বিকার। সাধারণ ছাত্রীরা বহূ অনুনয় বিননয় করেও প্রশাসনের সাহায্য পায়নি । আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এ সংক্রান্ত কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা আগাম সংবাদ বা সংকেত কিছুই ছিল না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে কেন এমনটি ঘটলো, তার কোন সদুত্তর নেই।
আজ ২৮ শে সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে “মাদার অফ হিউম্যানিটি” শেখ হাসিনার ৭৬ তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের দোয়া ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলবো, ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্বের নামে যারা লুটতরাজ, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক জুলুম নির্যাতন করে, তাদের এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ও অকর্মণ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে মাতৃস্নেহ নয়, প্রয়োজন মায়ের কঠিন শাসন ও উপযুক্ত বিচার। রোহিঙ্গাদের নেপথ্যে অনেক এনজিও আছে, মানবাধিকার সংস্থা আছে, দাতা সংস্থা আছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজ কতিপয় পথভ্রষ্ট, তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নিরব সন্ত্রাসের শিকার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পিছনে কেউ নেই। সত্যিই তারা অসহায়। আপনি তাদেরও “মাদার অফ হিউম্যানিটি” হবেন, এটাই প্রত্যাশা। যে শিক্ষা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসন অসহায় ছাত্রছাত্রীদের কন্যা দিবসেও নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। তবেই আপনার নাম ইডেনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা