মুনিমা সুলতানা : সাংবাদিকতায় আবার ছেলে আর মেয়ে কী? নারী সাংবাদিকদের সংগঠন করার ক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীদের মুখে এই বাক্যটি যত শোনা যায় তত শোনা যায়না যোগ্যতা অনুযায়ীদের তাদের নারী সহকর্মীকে কোন পদে দেখতে না পেলে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সংখ্যা কম হলে সাংবাদিকতায় নারীদের পদচারণা এখন আর চমকে দেয়া কোন ব্যাপার না। দু একজন করে শুরু করা এই পেশা এখন অনেক মেয়েদের জন্য আকর্ষণীয়, আগ্রহের। সামাজিক, পারিবারিক নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে, ধ্যান ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে প্রায় সব ধরনের গণমাধ্যমে বেশ ভাল সংখ্যায় এখন নারীদের দেখা যাচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে শুরু করে অনলাইনে তাদের পারদর্শীতা লক্ষ্যনীয়।’ এই পেশা মেয়েদের জন্য না’, রাতে মেয়েরা কেমন করে কাজ করবে’, রিপোর্টিং না ডেক্সের কাজ মেয়েদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যের আর নিরাপদ’- এমন সব কথাগুলোকে গুড়িয়ে তারা প্রমাণ করেছে তারা যোগ্য। যার কারণে সাংবাদিকতা পেশার শিক্ষানবীস থেকে শুরু করে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে তাদের পদচারনা অনেক বেড়েছে। এমনকি পুরুষ অধ্যুষিত নিউজ রুমের চাপিয়ে দেয়া ‘স্ফটবিট’ এর গণ্ডি ভেঙ্গে তারা এখন রাজনীতি, আইন, বিজ্ঞানসহ অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় দক্ষ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছে। অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় যেমন – ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার বাজার বিটে তাদেরকে দেখা যাচ্ছে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আর দক্ষতা প্রমান করতে।
এসব যোগ্যতা প্রমান করার পরও এখনও অনেক মিডিয়া হাউজেই নারীর পদোন্নতি সহজ নয়। অনেকে একে সহজ করে নিতে পারে না। নারীকে নতুন করে যোগ্যতা প্রমান করতে হয়। সেই পুরুষ সহকর্মীদের মুখ থেকে আসা ‘সাংবাদিকতায় পুরুষ আর নারী কী’ বাক্যটির মর্মার্থ মনে করিয়ে দিতে হয়।
আজকে নারীরা সাংবাদিকতায় একধাপ এগিয়ে প্রধান প্রতিবেদক, নিউজ এডিটরসহ নানা পদমর্যাদায় কাজ করছে। তারা প্রমাণ করছে পুরুষ সহকর্মীদের মতো এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে নারী সাংবাদিকরা বেশি যোগ্য কিন্তু এখনও মেয়েদের বেলায় এসব পদে পদোন্নতি বা নিয়োগে প্রশ্ন আসে ‘ও (নারী) কি পারবে?’ বেশিরভাগ নারী সহকর্মীকে এই ধারণা ভাঙতে হয়। নতুন করে প্রমাণ করতে হয় যোগ্যতা। প্রশ্ন উঠে বলে সে কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন পদে নির্বাচনে কম যােগ্য হয়ে উঠে। চাকরি বদলের ক্ষেত্রে একজন সিনিওর পুরুষ সাংবাদিকের অগ্রাধিকার এসে যায়। আবারো সাংবাদিকতায় পুরুষ আর নারীর ব্যাপারটা চলে আসে।
নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বর্তমানে কতো তার সঠিক তথ্য নাই কারো কাছে। তবে সঠিক সংখ্যা যাই হোক না কেন পুরুষ সাংবাদিকের তুলনায় তাদের চিত্রটা কে বলা যায় ‘ডুপ্লেক্স আর হাইরাইজ বাড়ির মত।’ মেয়েদের সংখ্যা ডুপ্লেক্স বাড়ি হলে ছেলেদের সংখ্যা হাইরাইজ। এই চিত্র জুনিয়র, সিনিয়রিটির ক্ষেত্রেও একই পাওয়া যায়। এই ব্যবধান কমাতে নারী সাংবাদিকদের কাছে এই পেশা আরো আকর্ষণীয় করা প্রয়োজন। যা একমাত্র এই পেশায় নিয়োজিত নারীদের পক্ষে সম্ভব। ঝরে যাওয়া নারীদের হতাশাগুলো তারা জয় করে এগিয়ৈ চলেছে ঠিকই। তবে তাদের এই অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে, দক্ষতা, সততা, ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের কাজকে আকর্ষণীয় আর অন্য সহকর্মীদের তুলনায় ভিন্নতা প্রমাণ করতে হবে। যেমন করে তারা নারী ও শিশুর মতো বিটকে আকর্ষণীয় করেছে, ভিন্ন একটা মাত্রা আনতে পেরেছে। নারী সংগঠনগুলো ছাড়া পেশাগত সংগঠনগুলোতে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এখনও নারী সদস্যদের সংখ্যা পেশাগত সংগঠনে খূবই অপ্রতুল। ছোট বড় সব সংগঠনে তাদের নেতৃত্ব বাড়াতে হবে। সেই সাথে পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে যোগ্যতা কোন ছক বাধা ফ্রেমে চিন্তা করলে চলবে না। তাদের উদ্যোগী হতে হবে মিডিয়া হাউজের সব শাখায় দক্ষতা প্রমাণে। সাংবাদিকতার চাকরির বাজার এখন আর কোন সীমারেখায় টানা যায়না। এত মিডিয়া থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে বলা যায় সাংবাদিকদের চাকরির বাজার নেগেটিভ। সহসা এর চিত্র বদলের সম্ভাবনাও কম। তারপরেও চাকরির চেয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে রেডি হতে হবে। এই পেশাটি যে অন্য দশটা পেশার তুলনায় ভিন্ন। চ্যালেঞ্জও অনেক এটা বুঝেই এগিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ভিন্ন হতে পারে। তাই হতাশা কাটিয়ে সুযোগকে সম্ভাবনায় তৈরি করতে হবে। সাংবাদিকতা একমাত্র একটা পেশা যেখানে একজন নারী নানা দক্ষতায় দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাদের পদচারণা বাড়ে। সামাজিকভাবে একটা মর্যাদা স্থান করে নিতে পারে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক, পারিবারিক নানা সংকীর্ণতা কাটিয়ে উদার মানসিকতা অর্জন করতে পারে। নানা পেশার নানা মতের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই পেশার পুরুষ শাসিত দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙ্গে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। নারীকে সবদিকে সচেতন করে তুলতে পারে। সাহসী করে তুলে। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে আরো যোগ্য করে তুলতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা জীবনের অনেক বড় সত্যকে আপন করে জয়ে আনন্দ উপভোগ করতে সাহায্য করতে পারে।
দেখতে দেখতে অনেকটা সময় চলে গেল। এক সময়ের দ্বিধা দ্বন্দ্বের সাংবাদিকতা পেশা এখন আত্মবিশ্বাসের আর আস্থার পেশা। এটি যেমন পুরুষের বেলায় সত্যি মেয়েদের বেলায়ও সত্যি। সময়ের সাথে সমাজে, পরিবারে এই পেশার গ্রহণযোগ্যতা এখন অনেক বেড়েছে। প্রত্যেক পেশার কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে, আবার সুবিধা থাকে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল হওয়া তখনই সম্ভব যখন ব্যক্তি ইতিবাচকভাবে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে। নারীদের এসব চ্যালেঞ্জগুলো ইতিবাচকভাবে নেয়ার প্রতিফলনে তাদের যে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে তা এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। দীর্ঘ দুই তিন দশকের রিপোর্টিং এর দক্ষতা তারপরও নিউজ রুমের নারী-পুরুষের যে বিরাট বৈষম্যকে কাঙ্খিত লেভেলে নামিয়ে আনতে পারেনি। এজন্য যেমন পুরুষ শাসিত মন মানসিকতা দায়ী তেমন নারীদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার যথেষ্ট উদ্যমের এবং লেগে থাকার অভাব কিছুটা কাজ করেছে। তাই পেশাদারিত্বের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝে দায়িত্বশীলতার প্রমাণ আরও দিতে হবে। তেমন অনেক মেয়েকেও পাওয়া যায় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার মন মানসিকতা পোষণ করতে। প্রি কনসেপ্ট ‘হবেনা’ ‘দিবোনা’ ‘করবেনা’ অনেককে সঠিক উদ্যোগ নেয়া থেকে দূরে রাখে। এসব নেতিবাচক শব্দের ব্যবহার বর্ন করে এগিয়ে যেতে স্থান করে নিতে হবে। যখন সত্যিকারের বলা যাবে সাংবাদিকতায় আবার পুরুষ আর নারী কি?
# লেখক, দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় স্পেশাল করেসপনডেন্ট হিসেবে কর্মরত।
(লেখাটি বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র’র তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে প্রথম প্রকাশিত হয়। ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে লাল সবুজের কথা’য় প্রকাশ করা হলো। )
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা