পর্ব-৩
আনন্দ আর কষ্টে মোড়ানো বিজয় দিবস!
তাসকিনা ইয়াসমিন
কলকাতায় পার্ক সার্কাসের কাছে কালাকার বিল্ডিং বলে একটা বিল্ডিং দোতলা, এই বিল্ডিংটা আমাদেরকে ভাড়া করে উনারা দিলেন। একজন বাবুর্চি দিলেন এবং সেখানে আমাদের জন্য রান্নাবান্না করে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকত এবং সেখানে আমরা গিয়ে সেই শেল্টারে থাকতাম। এই বাড়িটি ছিল, প্রখ্যাত নেত্রী ইলা মিত্র যেই ফ্ল্যাটে থাকতেন ঠিক তার রাস্তার উল্টো দিকে। ওখান থেকে ইলামিত্রের বাড়িটা দেখা যেত। ওখানে সিপিবি এবং সিপিআইএমের নেতারা অনেকেই আসতেন। তাদের অনেকের সঙ্গে আমাদের দেখা হতো।
তো সেই বিল্ডিংয়ে আমরা মানে, বাকি সময়টা মুক্তিযুদ্ধের বাকি সময়টা, কলকাতায় যখন থাকতাম, সেখানে হয়ত স্থায়ীভাবে থাকতাম না, হয়ত দুইদিন থাকতাম, তিনদিন থাকতাম, কোন মিটিং বা কোন সম্মেলন (এরই মধ্যে আমাদের সম্মেলনও হয়েছে), নেতারাও থাকতেন। নেতৃস্থানীয় কর্মীরা থাকতেন। ওখান থেকে আমরা আমাদের কাজ ছিল কার কানেকশনে কয়জন আছে সেটা লিস্ট করে (আমরা হয়ত খবর পেলাম যে অমুক বর্ধমানে আছে বা কেউ শান্তিপুরে আছে বা কালনায় আছে বা আরো বিভিন্ন শহরে আছে) সেই যায়গাগুলােতে খুঁজে খুঁজে যেতাম। তো এইরকম একটা যায়গা কল্যানীর কাছে একটা স্টেশন আছে, স্টেশনটার নামটা আমি ভুলে গেছি। আমাদের এক বন্ধু ছিলেন কুষ্টিয়ার যে বার লাইব্রেরি, তার লাইব্রেরিয়ান।
তার নাম হচ্ছে আব্দুস সামাদ। সামাদ ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি হচ্ছে পশ্চিমবাংলায়। কল্যানী স্টেশনের ঠিক আগের স্টেশনটাই হচ্ছে শ্বশুরবাড়ি যাবার স্টেশন। আমাকে উনি ঠিকানাটা দিয়ে গেছিলেন। তো উনি ঠিকানা দেয়ার কারণে, উনি বলে গেছিলেন আমি সীমান্ত পার হয়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকব। আমি কোন ক্যাম্পে থাকব না। আমি গিয়ে সেই স্টেশনে নেমে দেখলাম যে, বাড়িটা খুঁজতে আমার খুব সময় লাগল না। বেশ বনেদি বাড়ি। অনেক বড় মুসলিম পরিবার। যাই হোক খুঁজে পেলাম। থাকলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি একটা নতুন জিনিস আবিস্কার করলাম। সেটা হচ্ছে এই ঐ ভদ্রলোক সামাদ ভাইয়ের শ্বশুড় তিনি একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। তিনি কংগ্রেস পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী। কিন্তু তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি খুব একটা সহানুভূতিশীল না। তিনি মনে করছেন পাকিস্তানকে ভাঙাটা ঠিক হচ্ছে না। ওখানে আরো কয়েকদিন থাকলাম আমি। ওখানে তাদের আরও প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন তারাও আসল।
তারাও মুসলিম। তাদের মধ্যে যারা একটু বয়স্ক। তারা কেউই দেখলাম খুব একটা আমাদের উপরে খুশি না। তারা বলল তোমরা এটা ভূল করছ। যাই হোক,পাকিস্তান ভাল হোক, মন্দ হোক একটা মুসলমানের দেশ ছিল এটা তোমরা ভেঙে দিলে, মানে তাদের কাছে সব তথ্য ছিল না। এটা হচ্ছে বয়স্কদের ধারণা, মুসলমানি আবেগের কাছে তারা খুব ধরা। ওখান থেকে আমার একটা ধারণা হলো একটা কাজ বোধহয় ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে কিছু কাজ করা খুব দরকার। তাদেরকে সচেতন করাটা জরুরি।
যাই হোক, আমি তাদেরকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম বাংলাদেশে কি হয়েছে। কিভাবে তাদের উপরে অত্যাচার করা হয়েছে। বৈষম্য করা হয়েছে। কিন্তু আমি সেটা শেষ করতে পারি নাই। ঐ আলোচনায় আমি তো প্রস্তুতও ছিলাম না। ওখান থেকে এসে আমি যখন আবার গেলাম আমার পার্টির নেতাদের সঙ্গে যখন আবার আলোচনা করলাম। কমরেড অমল সেন এবং অন্যদের সঙ্গে। তখন তারা জিনিসটা রিয়ালাইজ করলেন এবং তাদের কাছেও এই তথ্য ছিল। তখন তারা বললেন যে, তাহলে আমাদের একটা কাজ হতে পারে এদেরকে যতটা পারা যায়, এদের মধ্যে প্রকৃত তথ্যগুলো তুলে ধরা। তাদেরকে এডুকেট করা। তাদেরকে জানানো। তখন আমি অনেকগুলা এলাকায় গেছি।
তখন আমি অনেকগুলো এলাকায় গেছি। বর্ধমান, মুর্শিদাবাদের বহরমপুর, তারপরে আরও কিছু এলাকা যেখানে গিয়ে আমি একটা মিশনই নিলাম যে আমার যাদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে সেই বন্ধুদের বলতাম যে, একটু এলাকার যারা বিভিন্ন বয়সের ইয়াং এবং এল্ডারলি সবাই তাদেরকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা। এতে অনেকে অনেক প্রশ্নও করত। সেই প্রশ্নের উত্তরও দিতে হতো। যারা বয়স্ক তারা কনভিনস্ড হতেন না। আবার অনেকে কনভিন্সড হতেন। যখন শুনতেন অনেক দু:খ, অনেক কষ্টের কথা যখন আমরা বলতাম তখন অনেকে কনভিন্সড হতেন। কিন্তু ইয়াং যারা তারা আবার দেখতাম যে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই বলছেন।
ইয়াংদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিল বামদের অনেক ছাত্র সংগঠনের কর্মী বা যুব সংগঠনের কর্মী ছিল – তো এটা একটা কাজ যা আমি বেশ কিছু যায়গায় করেছি। আর আমাদের যেগুলো জনগণকে সচেতন করার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য, অনেক ধরণের লিফলেট তৈরি করে জনগণকে বলা, যে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কিভাবে সাহায্য করতে হয়, কিভাবে তথ্য দিতে হয়। এটা বর্ডারে এসে বর্ডারের বিভিন্ন পরিচিত লোকের মাধ্যমে ভিতরে পাঠাতাম। এটাও একটা কাজের মধ্যে ছিল। তো এভাবেই মোটামুটি বলা যায় যে, জুন মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ছয় সাত মাস এইভাবেই কেটে গেছে। আর বিজয় দিবসে আমি দেশে আসি নাই। আমি বিজয় দিবসের পরে এসেছি। কারণ তখন আসা সম্ভব ছিলনা।
আমি যেমন বিভিন্ন যায়গায় গেছি, বিভিন্ন পরিবেশে আলোচনা করেছি, আর যেটা করেছি বিভিন্ন ধরণের লিটারেচার সংগ্রহ করেছি। বই সংগ্রহ করেছি। মোস্টলি বামপন্থীদের জন্য যেগুলো শিক্ষণীয় বই। কিছূ আমি ডোনেশন হিসেবে পেয়েছি কিছু আমি আমার পকেটের পয়সা থাকলে কিনে নিয়েছি এবং আমি যখন ডিসেম্বর মাস আসল তখন আমার প্রায় এক ট্রাংকেরও বেশি বই, প্রায় দেঢ় ট্রাংক বই আমি নিজে নিলাম। এখন বই নিয়ে আমি কি করে আসব। আমি তো ট্রেন ছাড়া আসতে পারব না। কারণ অন্যকোন রাস্তা আমার ছিল না।
কিন্তু ট্রেনে কোন জায়গা পাওয়া যেত না। এত ভীড় ছিল। কারণ এক কোটি মানুষ এসেছে। তারা তাে সবাই যখন দেশমুক্ত হয়েছে তাড়াহুড়ো করে সবাই আসার জন্য তো পাগল হয়ে গেছে। তখন ট্রেনের জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। জানুয়ারির প্রায় ১২-১৩ তারিখ পর্যন্ত। ট্রেনে জায়গা পাওয়ার জন্য। কারণ ঐ পরিস্থিতিতে খুব কষ্টকর একটা পরিস্থিতি। তো সেভাবেই এসেছি।
যুদ্ধের মধ্যে কুষ্টিয়াতে থাকাকালে যেটি ঘটেছিল -আমার এক বন্ধূর মামা কুমারখালী এমএন হাইস্কুলের ম্যাথমেটিসকের খুব বিখ্যাত শিক্ষক। উনি নিখোঁজ হয়ে গেলেন। আমি তাকে ধরে নিয়ে গেল। তার কোন খোঁজ নেই। দুই নম্বর হচ্ছে। পরান ব্যানার্জী উনি মোহিনী মিলে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে আমার পরিচিত। উনি একজন মিড লেভেলের কর্মচারি ছিলেন। উনার দাদা হচ্ছেন হারাধন ব্যানার্জী। বিখ্যাত অভিনেতা। সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবিতে উনি অভিনয় করেছেন। কিছুদিন আগ পর্যন্ত উনাকে সিরিয়ালেও দেখা যেত। উনার ছোট ভাই হচ্ছেন পরানদা। পরানদা আমার খুব ঘনিষ্ঠ। উনি নিজেও অভিনয় করতেন কুষ্টিয়ায়। উনি নিজে একদিন এসে বললেন, আমি কোনমতে জান নিয়ে বেরিয়ে এসেছি।
আমার স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে আসতে পারিনি। এখন তাদের উদ্ধার করতে হবে। তো আমি তাদের উদ্ধার করার জন্য আমি, কিভাবে উদ্ধার করা যায় ঐটা মনে করে আমি শহরে রওয়ানা হলাম। এক হচ্ছে উনার স্ত্রী ও দুই ছেলে এবং দুই হচ্ছে আমার বন্ধূর সেই মামা। মামার নামটা মনে পড়ছে না। উনাদের খোঁজ নেয়ার জন্য আমি শহরের দিকে যাত্রা করলাম। কিন্তু এমনভাবে গেলাম যে যেন আমাকে কেউ চিনতে না পারে। আমি লুঙ্গি পরে সাধারণ কৃষকের পোশাক পর আমি শহরে ঢুকলাম। আমি যখন শহরে ঢুকলাম বিহারিরা বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারা দিত। অবাঙালি তো ওর মধ্যে একজন আমাকে চিনেছে। সে চেনার কারণেই আমি ধরা পড়ে গেলাম। আমাকে নিয়ে যেহেতু আমার রাজনৈতিক পরিচয় জানা আছে, আমাকে মেরে ফেলার জন্য প্রতিদিনই মানুষ মারা হচ্ছে। তখন প্রায় আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম আমাকে এরা শু্ট করবে না।
হঠাৎ আমার মনে হলো, আমার সঙ্গে একজন ছিলেন তিনি মোহিনী মিলের শ্রমিক কিন্তু তিনি বয়স্ক বলে তারে আটক করেনি। সে খুব ভাল উর্দু আর হিন্দি দুটোই বলতে পারত। তো সে বাঙালি না বিহারি সেটা বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু সে একটা বুদ্ধির কাজ করেছিল। সে আমাকে ধরার সাথে সাথে শহরের ভিতরে ঢুকে গেছে। ঢুৃকে গিয়ে শরবতি খান বলে একজন পাঠান আছে এবং সে খুব পাওয়ারফুল ছিল তখন। বাঙালিদেরকে সেভ করার জন্য। উনি আবার আমার খুব ঘনিষ্ঠ। উনি একজন পাঠান, পেশোয়ারের লোক বহুবছর কুষ্টিয়ায় ছিলেন। তাকে গিয়ে বলেছে যে এরকম আমাকে পাকড়াও করেছে। আমাকে মেরে ফেলবে। তো সে তখন একটা স্টেনগানসহ, একটা সাইকেলে করে খুব দ্রুত চলে এসেছে।
শরবতি খান আসার পরে এরা নরম হয়েছে। এদের খুব বকাবকি করল। আমি যেটা করলাম ওদের সঙ্গে আমি আধা ঊর্দু আধা বাংলায় ওদের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করে সময়টা ক্ষেপণ করা। আমি যখন বুঝলাম এরা তো আমাকে আটকিয়েছে যতক্ষণ পারা যায়। আমার সঙ্গী যখন গেছে। তিনি শ্রমিক আন্দোলনের বড় নেতাও ছিলেন। জেলও খেটেছেন। জ্যোতিবসু থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। যে কারণে সে হিন্দি, উর্দু সবই তার রপ্ত ছিল। যাই হোক সে যখন গেছে সে একটা কিছু করবে। আমি এদের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক করছি। এরমধ্যে সে এসে আমাকে উদ্ধার করেছে। এই স্মৃতিটা আমাকে খুব আবেগাপ্লুত করে।
আমি নিজে উদ্ধার হওয়ার পরে আমি শরবতি খানের সাহায্য নিয়ে আমি যেটা করলাম ঐ মামার খবরটা আমি জেলথানায় খুঁজলাম। নামটা নিয়ে শরবতি খান পুরো জেলখানায় খুঁজল কিন্তু তাকে পাওয়া গেলনা। তখনকার মেজর ছিল একজন পাঠান সে গিয়ে সেই মেজরকে জানাল, কুষ্টিয়ার চার্জে – কমান্ডার। মেজর একজন ক্যাপ্টেনকে দিয়ে পাঠাল যে প্রত্যেক সেলে খোঁজ কর। এই নামে কেউ আছে কিনা। দেখল যে সে নেই। তখন বোঝা গেল যে তাকে মেরে ফেলেছে। সেটা কুমারখালীতেই হোক বা বাইরে নিয়ে এসে মারা হোক। তাদের জিম্মায় নাই। মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল যেহেতু তাদের জিম্মায় নাই তাই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
আর পরানদার পরিবারের সদস্যরা আটকা ছিল মোহিনী মিলের একটা স্টাফ কোয়ার্টারে। তাদেরকে ওদের মাধ্যমেই উদ্ধার করলাম। আমাকে ওরা নিশ্চিত করল যে দুইদিনের মধ্যে তাকে বের করে দিবে। একজন নেপালি দারোয়ান ছিল তাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তুমি কিভাবে বের করবে সেটা কৌশলে বলে দেয়া হলো। শরবতি খানই করল। পরে তারা গ্রামের মধ্যে একটা সেফ জায়গা পর্যন্ত তারা নিয়ে গেছে। পরে তার হাজব্যান্ড এসে সেখান থেকে নিয়ে গেছে। তারা উদ্ধার পেয়েছিল। কিন্তু তার মামাকে আর বাঁচানো গেল না। মানে তিনি আসলে বেঁচেই ছিলেন না।
যদি একাত্তর সালের বিজয় দিবসের স্মৃতির কথা বলি-নি:সন্দেহে একটা গর্ব, একটা আনন্দ, এটা তো ছিলই, তারসঙ্গে ছিল দু:খ, তার সঙ্গে ছিল কষ্ট। কারণ এই আনন্দের এই আত্মসমর্পণ যৌথ কমান্ডারদের কাছে, কারণ এই আনন্দের সংবাদটা এসেছে অনেক মূল্যের বিনিময়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ, আপনজন তাদের মানুষ। আমি আমার নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। আমি জানতাম না আমার ধারণা ছিল না আদৌ কয়জন বেঁচে আছে। কয়জন বেঁচে নেই। তারাও জানত না আমি বেঁচে আছি কিনা। আমার বেঁচে থাকা নিয়ে সন্দেহ ছিল। আমি চেষ্টা করেছি ওখানে থাকা অবস্থায়। কিন্তু আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারিনি। আমার দুইভাই তারা ভারতে গিয়ে, ট্রেনিং নিয়ে আবার দেশে ফিরে গেছে। এটা আমি পরে জেনেছি।
দেশমুক্ত হওয়ার পরে আমি এটা জেনেছি। সেদিক থেকেও একটা দুশ্চিন্তা ছিল। তারপরে যাই হোক ফিরে এসেছি। এসে যখন দেখলাম ভালও লাগল। এসে আমি অাবার কিছু রিলিফের কাজ করলাম। সামাদ ভাইয়ের সাথে মিলে আমরা যে শরনার্থীরা আসছে তাদেরকে, এসে যারা দেশে ঢুকছে তার নিজের বাড়িটা সে চিনতে পারছে না। ভাঙাচোরা হয়ত লুট হয়ে গেছে সবকিছু। হিন্দুদের বাড়িতো বটেই, এমন কি মুসলিম সাধারণ মানুষদের বাড়ির একই অবস্থা। তখন কিছু রিলিফ ম্যাটেরিয়াল আসত। আমি সেই রিলিফের মধ্যে ঢুকে গেলাম।
প্রথম প্রায় তিনচার সপ্তাহ আমি রিলিফের কাজই করলাম। তারপরে আস্তে আস্তে আমি অন্যকাজে মনোযোগ দিলাম। তারপরে আমি দেখলাম যে, মুক্তিযুদ্ধের যে অর্জন সেই অর্জনগুলোকে মনে রাখা বা সেগুলোকে সফল করার জন্য যে প্রচেষ্টা, সেই প্রচেষ্টাটা ক্রমাগত দূর্বল হতে থাকল। বরং দেখলাম মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে একটা যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারি তাদের, তো এইসব কারণে খুব মন খারাপ হচ্ছিল যে, এক শ্রেণির লোক নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য, নিজেদের প্রতিপত্তি, বিভিন্ন ধরণের বাড়িঘর দখল করা, বিশেষ করে অবাঙালিদের এটা একটা ব্যাপক লুটপাট এবং ওরা যেটা রিলিফ বিতরণের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। যেটা পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু একাধিকারবার উল্লেখ করেছেন।
তারপরের ইতিহাস তো অন্য ইতিহাস। সেই ইতিহাসে আমি আর যাচ্ছিনা। আজকের বাংলাদেশের যে বিজয় দিবস এটা আমার কাছে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা বলে মনে হয়। এইজন্যে মনে হয় যে, আমরা ইতিহাসের ঐ কঠিন দিনগুলাে সেগুলো সেভাবে আমরা কতটা স্মরণ করি সেটা আমার সন্দেহ হয়। দুইনম্বর হচ্ছে আমরা যে মূল্যবোধগুলোর জন্য লড়াই করেছি সেই মূল্যবোধগুলো কতটা গত আটচল্লিশ বছরে অর্জন করেছি সেটারও মূল্যায়ন করতে আমরা চেষ্টা করিনা। আমরা যখন যারা করি নিজেদের প্রশস্তি, নিজেদের প্রশংসা এটাই আমরা করি।
আর আমাদের ভুলগুলো সে ভুলগুলো শুধরানোর কোন প্রচেষ্টা আমি দেখি না। তো, আমার কাছে এখনকার বিজয় দিবস সেইভাবে খুব যথেষ্টমাত্রায় আমাকে, কি বলব, আমি খুব উত্তেজনা অনুভব করিনা। খুবই সাদামাটাভাবে এই বিজয় দিবস। এই দিবসে মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে আমরা হানাদারদের পরাস্ত করেছিলাম, তারা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এইটুকু অর্জন ছাড়া অন্য অর্জনগুলোতো আমরা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের বৈষম্য বেড়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক অনাচার বেড়েছে, নারীর প্রতি শিশুদের, সংখ্যালঘুদের প্রতি, মানুষের প্রতি সহিংসতা, অনাচার, তাদের প্রতি যে নির্মম আচরণ সেগুলো ক্রমাগত বাড়ছে বই কমছে না। উন্নয়নের একটা ধারা চলছে।
অনেক কিছুই উন্নত হয়েছে। জিডিপি বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে। কিন্তু মানুষের বৈষম্য অনেক বেড়ে গেছে। সেটার কথা আমরা কেউ ভাবছি না। বেশিরভাগ মানুষ তাদের একটা অনিশ্চয়তার জীবন যাপন করছে। বেশিরভাগ পরিবারের সন্তানরা কোয়ালিটি এডুকেশন পাচ্ছেনা। তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেনা। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে। অনেক হাসপাতাল হয়েছে। তারপরও মানুষ তো চিকিৎসার জন্য অনেক পরিবার নি”স্ব হয়ে যাচ্ছে। এমন সব কঠিন পরিস্থিতি হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র আমাদের ব্যবস্থা নাই তাদেরকে কোন সাহায্য সহযোগিতা করার। আমরা ৪৮ বছরেও এমন কোন ব্যবস্থা করতে পারলাম না যেখানে সাধারণ মানুষ অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং অন্যান্য যে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা, আবাসন এইসবগুলোতে তারা কিছুটা স্বস্তির মধ্যে বসবাস করবে। সেরকম কোন নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছিনা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে সব যায়গায় একটা অনিয়ম এবং দুর্নীতির রাজত্ব। দুর্নীতি এবং অনিয়মের যে রাজত্ব এটা ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে এবং সেটা রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায়, রাষ্ট্রের শক্তিটাকে, রাষ্ট্রের মধ্যে যাারা আছেন তাদের মধ্যে হয়ত অনেকের সদিচ্ছা আছে এই দুর্নীতিটাকে মুক্ত করার কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক কম।
অনেক বেশি প্রবল যারা দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে আগ্রহী এবং সব জায়গায় তাদের দাপট। এই যে আমাদের ব্যাংকের দুরবস্থা দেখছি যে, হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার কোটি টাকা বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন খবর, এই খবরগুলাে আমাদেরকে যেমন বিস্মিত করে তেমনি আমাদেরকে কষ্ট দেয়। যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরেও আমরা আমাদের দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, দেশের রাষ্ট্রকাঠামো এবং আমাদের বিভিন্ন স্তরের যারা আছেন তাদের মধ্যে আমরা এতটুকু সততাকে আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলাম না যে তাদের উপরে আমরা নির্ভর করতে পারি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা একটা চরম একটা সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের সহযোগি করে তুলেছি।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুলিয়ে ফেলছি। আমি মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধের পক্ষে না। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষায় যে শিক্ষা চলে আসে সেই শিক্ষা তো আমাদের শিক্ষাকে পিছিয়ে দিবে। ধর্ম শিক্ষা ধর্মের জন্য কিন্তু যদি জীবনকে উন্নত করতে হয়, তাহলে অবশ্যই ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, অংক, প্রত্যেকটা ছেলেমেয়েকে শিখতে হবে এবং প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ের সমান একটা স্ট্যান্ডার্ডে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। সে দরিদ্র, সে ধনী হোক, কারণ শিক্ষায় বৈষম্য করা চলে না। বেশিরভাগ স্কুলগুলো আজকে চরম একটা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
কিছূ প্রাইভেট স্কুল কলেজ সেগুলো যদি আজকে অনেক বেশি উন্নত মানে যাদের অনেক অর্থবিত্ত আছে তারা অনেক টাকা খরচ করে সেসব জায়গায় পড়াতে পারে। অনেক সাধারণ মানুষ সেটা পারেনা। পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষাকে রাষ্ট্রর কাছে রাখে। বিশেষ করে প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত। এই শিক্ষাটা অবশ্যই রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে, মানসম্মত শিক্ষা এবং সকলের জন্য। এই শিক্ষাটা আমরা এখনও পর্যন্ত ঠিক করতে পারলাম না যে, আমরা শিক্ষা কি ডিগ্রি দেয়ার জন্য দিচ্ছি। না জীবনে কাজে লাগানোর জন্য। যে কারণে আমাদের অনেক ছেলেমেয়ে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে কিন্তু তারা চাকরি পাচ্ছে না। কারণ শিক্ষাটার সঙ্গে জীবনের যে চাহিদা তার পেশাগত দক্ষতার কোন সম্পর্ক নেই।
সেই পেশাগত দক্ষতা বা জীবনে যে মানুষ হওয়ার যে শিক্ষা এই বিষয়গুলোকে সেইভাবে আমরা প্রাধান্য দেইনি। আমরা কতগুলো ডিগ্রি দেয়ার জন্য, কতগুলো সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য কিছু প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আসরা করতে দিয়েছি । এটা কতটা আমাদের শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাজে লাগাবে সে ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বরং এগুলো অনেক লায়াবিলিটি তৈরি করছে। আমাদের শিক্ষা যেখানে আমাদের একটা আমুল সংস্কার দরকার ছিল এবং অনেকগুলো কমিশন হয়েছে। সর্বশেষ কমিশন যে সুপারিশগুলো
দিয়েছে সেই সুপারিশগুলোও কার্যকরী করা হচ্ছে না। সেই সুপারিশগুলিও অধিকাংশই অকার্যকর থেকে যাচ্ছে। তাহলে এই কমিশনগুলো করার দরকার কি ছিল? আমাদের কুদরতে খুদা কমিশন থেকে শূরু করে অনেক কমিশনের অনেক সুপারিশ ছিল যেগুলাে অনেক কনস্ট্রাকটিভ, খুবই গঠনমুখী এবং জীবনমুখী।আমাদের জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থাটাকে তৈরি করার জন্য যে ধরণের ইনভেস্টমেন্ট দরকার। যে ধরণের অর্থ ব্যয় করা দরকার। যে পরিমাণ মনোযোগ দরকার। যে পরিমাণ ডেডিকেশন দরকার, যে পরিমাণ আমাদের অঙ্গীকার দরকার।
সে সব কিছুরই মনে হচ্ছে আমাদের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। সুদুরপ্রসারী একটা ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কারণ আমাদের জনসংখ্যা এটা যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গতি অনেক বেশি অনেক বাধাগ্রস্থ হবে। এই মুহুর্তে আমাদের দেশের অনেক অর্থনীতি নিয়ে অনেক কথা বলি। বাইরের দেশের লোকরা আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসে আছে। কারণ তারা অনেক বেশি দক্ষ। এই দক্ষতাতো আমরাও অর্জন করতে পারতাম। আমরা আমাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদেরকে দক্ষ না করে আমরা বাইরের দক্ষ লোক নিয়ে এসে আমরা তাদেরকে এখান থেকে অর্থ পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছি।
তারা এখান থেকে রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে। তো আমাদের অর্থনীতিতে তারা কতটুকু কন্ট্রিবিউট করছে এবং এটা বেশিদিন চলতে থাকলে তো এটা অন্য ধরণের টেনশন তৈরি হবে এবং এটা আমাদের অনেক ক্ষতির কারণ হবে।
(সমাপ্ত)
# শামসুল হুদা, উন্নয়নকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।
# সিনিয়র স্টাফ রিপাের্টার।
আরও পড়ুন : পর্ব – ২, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতীয় মুসলিমদের জানানোর কাজ করতাম আমি : শামসুল হুদা
আরও পড়ুন : পর্ব – ১, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতীয় মুসলিমদের জানানোর কাজ করতাম আমি : শামসুল হুদা
আরও পড়ুন : পর্ব- ৪, আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : পর্ব -৩ আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : পর্ব – ১ : আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : আসলে একাত্তর সালের সময়টা মুখের কথায় বর্ণনা করা অত্যন্ত কঠিন : কামাল আহমেদ
আরও পড়ুন : রাজাকার যখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তখন খুব খারাপ লাগে : আব্দুস সামাদ তালুকদার
আরও পড়ুন : রক্ত স্রোতে পবিত্র হয়ে জন্ম নিয়েছে বাঙালি জাতির স্বাধীন বাসভূমি বাংলাদেশ : ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ
আরও পড়ুন : আমাদের মতো মানুষের কাছে একাত্তরের স্মৃতি বিবিধ : আফসান চৌধুরী
আরও পড়ুন : একদিকে বিজয়ের উল্লাস, অন্যদিকে প্রিয় দুই শিক্ষকের মৃত্যু আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল : ডা. মাগদুমা নার্গিস রত্না
আরও পড়ুন : রেডিওতে পাক-সেনাদের আত্মসমর্পণের খবর শুনে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে যাই : সাইফুল ইসলাম
লালসবুজের কথা’র ফেসবুক পেজ :
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা