পর্ব - ২
আনন্দ আর কষ্টে মোড়ানো বিজয় দিবস!
তাসকিনা ইয়াসমিন
কলকাতায় গিয়ে কলকাতায় সিপিএম এর অফিসটা তখন চেনা ছিল। আগেই আমি এপ্রিল মাসে আমি আমার এক বন্ধুকে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলাম। গিয়ে আমি জ্যোতিবসুর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করি। সিপিএম এর অফিসে গিয়ে। এর আগে সিপিএম এর অফিস আমি যাইনি। সিপিএম এর অফিসের ঠিকানাটা আমাদের কাছে ছিল। এইজন্যে কারণ সিপিএম এর কিছু লিটারেচার ঐ বর্ডার থেকে আমি এবং আমার এক বন্ধু নিয়মিত আনা নেয়া করতাম। যারা স্মাগলিং করে তাদের মাধ্যমে এই লিটারেচারগুলো আনানোর ব্যবস্থা হতো।
কারণ বর্ডারে তো একটা এরেঞ্জমেন্টের মাধ্যমে এরা যায়। ওপারে কিছু জিনিস বিক্রি করে। এপার থেকে কিছু জিনিস নেয়। তো তখন এইরকম পরিচিত যোগাযোগ আমরা পেলাম যারা মানে স্মাগলিং বলা যায়, তারা স্মাগলিংই করে। সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর দরকার ছিলনা। সেই উপলক্ষে মাঝে মাঝে কলকাতা যায়। তাকে আমরা দায়িত্ব দিলাম যে, তোমার খরচ টা আমরা দিয়ে দিব। তুমি কলকাতায় এই এই জায়গায় গিয়ে এই এই পত্রিকা গুলো কিনে নিয়ে আসবে আমাদের জন্য। এটা সে প্রায়ই করে দিত।
কারণ বামপন্থী লিটারেচার তখন পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ছিল। যদিও সোভিয়েত রাশিয়ার কিছু লিটারেচার আসা শুরু হয়েছিল আইয়ূব খানের পতনের পরে। কিন্তু পশ্চিম বাংলা থেকে আসত না। ইন্ডিয়ার সঙ্গে তো পাকিস্তানের সম্পর্ক ভাল ছিল না। তো, যাই হোক সেই সুবাদে সিপিএম এর অফিসের ঠিকানা ছিল। জ্যোতি বসুর সঙ্গে পরিচয়ও নাই। কিছুই নাই। আমরা জ্যোতি বসুর নাম জানি যে বিখ্যাত নেতা। তার সঙ্গে দেখা করব, আমরা সাহায্য সহযোগিতার জন্য আমরা দুই বন্ধু অতি উৎসাহী হয়ে চলে গেলাম। যখন যাই তার অফিসে পৌঁছালাম। গিয়ে আমরা পরিচয় দিলাম। তারা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে গ্রহণ করলেন। বিএল চক্রবর্তী বলে একজন ছিলেন। উনি পিএস এর কাজটা করতেন।
পার্টি কর্মী কিন্তু কাজটা করতেন। তার সঙ্গে পরিচয় হয়নি কিন্তু তাকে গিয়ে বললাম। ভিতরে খবর দেয়া হলাে। উনি পরে এসে বললেন যে উনার সঙ্গে তো দেখা হবে না, কারণ জ্যোতি বসু তখন কলকাতায় ছিলেন না। উনাদের পলিটব্যুরোর মিটিং ছিল সেই মিটিংয়ে চলে গেছেন। বলল যে, এখানকার আর একজন নেতা পশ্চিম বাংলা নেতা, পরে মন্ত্রী হয়েছেন, কৃষ্ণপদ ঘোষ সংক্ষেপে কৃষ্ণঘোষ। তাকে বলা হলো। উনি অফিসে আছেন, আপনারা উনার সঙ্গে দেখা করতে পারেন। তারপরে ভিতরে নিয়ে গেলেন। আমি আর মতিউর রহমান বলে আমার এক বন্ধু, এখন সে কুষ্টিয়ায় আছে, খুব অসুস্থ, আমরা দুই ইয়াং ছেলে আর উনি তো বেশ প্রবীণ অভিজ্ঞ নেতা, কিন্তু উনি তো একা না আরও কয়েকজন আছেন, পরে সবার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। উনি জিজ্ঞেস করলেন আপনারা কোথা থেকে এসেছেন। আমি বললাম। রাজনীতি করেন কিনা? কোন দল করেন? আমরা পরিচয় দিলাম।
উনি বললেন আপনাদের পরিস্থিতিটা কি? বলেন, আমাদের। আমরা বললাম। তখন হচ্ছে এপ্রিল মাস। তখন প্রথমবার আমরা মুক্ত করেছি। তখন আমরা বেশি আশাবাদী হয়ে গেলাম। এই যে আমরা মুক্ত করেছি যদি আরও কিছ অস্ত্র পাই তাহলে আমরা পাকিস্তানিদের আর ঢুকতে দেবনা। তাদের ঠেকিয়ে দিব। সেইরকম একটা অতি উৎসাহ নিয়ে আমরা বললাম যে আমাদের সাহায্য দরকার। তারপর উনি ব্যাখ্যা করলেন যে দ্যাখেন আমরা তো ভারতের সরকারি দল না। সরকার আমরা নিয়ন্ত্রণ করিনা। পশ্চিমবঙ্গেও আমরা বিরোধী দল।
লোকসভায়ও তাদের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। সেই কারণে, সিপিএম এর অফিসটা আমি চিনতাম। আমি যখন জুনমাসে গেলাম, তখন সেই অফিসে গিয়েই শুনলাম যে আরও কয়েকজন নেতা এসেছে। কমরেড অমর সেন, হাজী দানেশ, খুলনার কমরেড নজরুল ইসলাম, কমরেড দেবেন শিকদার, উনারা এসেছেন কিন্তু উনারা কোথায় আছেন? বলল যে উনারা কোথায় আছেন আমাদের কাছে ঠিকানা নেই, এই অফিসে এলে উনাদেরকে পাবেন। খবর নিয়ে আমি একটা চিঠি লিখে রেখে আসলাম। আমার পরিচিতদের মধ্যে ছিলেন কমরেড নজরুল ইসলাম তার জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে আসলাম। চিঠি দিয়ে আমি আবার চলে আসলাম। চলে এসে পরের দিন আবার গেলাম। গেলেই দেখলাম যে, নজরুল ভাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারপরে উনি আমাকে একটা শেল্টারে নিয়ে গেলেন। আমার সেই বন্ধু জুনে যায় নি, সে এখানেই থেকে গিয়েছিল।
এর আগে যেটা হয়েছে যে যখন অসহযোগ চলছে তখন কুষ্টিয়ার কিছু মানুষ, তারা এলিট, তাদের বাড়িতে বন্দুক ছিল। তারা আমাকে চিনত। তারা আমাকে ডেকে নিয়ে তাদের বন্দুকগুলো দিয়ে দিল। তাদের লাইসেন্স করা বন্দুক কিন্তু। চিন্তা করতে পার? এতটা আস্থা! এরমধ্যে একজন ছিলেন ডা. তোফাজ্জল হক, তিনি একজন লিডিং ডক্টর। আর একজন হচ্ছেন ডা. ফজলে রব, কুষ্টিয়ার একজন জাহেদ রুমি তার মামা। আমিও তাকেই মামা বলতাম। উনাদের দুজনের দুইটা লাইসেন্স করা বন্দুক আমাকে বলল যে, এটা আপনার কাজে লাগবে।
আমি এই বন্দুক রেখে কি করব? ট্রেনিং দেবেন কিছু অস্ত্র তো লাগবে এটা নিয়ে যান। ফজলে রবও তাই বললেন। আরও একজনে আর একটা বন্দুক দিলেন তার নামটা আমি ভুলে গেছি। ডা. টি. হকের বাসার পাশেই তার একটা দোকান ছিল তাদেরও একটা দোকান ছিল, সেও তার বন্দুকটা দিয়ে দিল। বন্দুক দিয়ে পরে যখন আমি ট্রেনিং শুরু করলাম কিছু কার্তুজ, এগুলো আমাদের সম্বল। যখন আমি পার হই তখন এই অস্ত্রগুলো কি করব? এগুলো নিয়ে তো পার হওয়া যাবে না। তখন এগুলো একজনের কাছে জিম্মায় রেখে গেলাম।
এই ট্রেনিংটা যাতে কন্টিনিউ করে, এদের সঙ্গে যাতে যোগাযোগের সুযোগ থাকে তার একটা চিন্তা করলাম। তখন তো আর এইরকম মোবাইল নাই। কিভাবে কিভাবে লোক মারফতে যোগাযোগ করলে পাওয়া যাবে একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা করে চলে গেছিলাম। ওখানে গিয়ে ভাবলাম যে এবার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেব। তারপরে বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে যখন প্রবাসী সরকারের অফিসে থিয়েটারে রোডে গেলাম। এপ্রিল মাসেই প্রবাসী সরকার হয়ে গেছে।
সেখানে গেলাম। গিয়ে দুই একজন পরিচিত পেলাম এবং তাদেরকে বললাম। কিন্তু যারা আমাকে বামপন্থী লোক হিসেবে জানত তারা খুব আগ্রহ দেখাল না। একজন নেতা ছিলেন আক্কাস ভাই বলতাম। কুষ্টিয়ার এমপি, আওয়ামীলীগের। বলল যে আচ্ছা আচ্ছা দেখব। মানে, খুব একটা আগ্রহ না। তারা মানে তাদের নিজস্ব মতের লোকজনদেরকেই চাইছে। বুঝলাম যে খুব একটা আগ্রহ নাই। তো যাই হোক ফিরে আসলাম। এর মধ্যে আমি আবার ভাবলাম যে, আমার অন্য যারা পরিচিত তারা কে কোথায় আছে তা তো জানিনা।
গেলাম কৃষ্ণনগর । কৃষ্ণ নগর থেকে গেলাম করিমপুরে, যে বর্ডার দিয়ে পার হয়ে এসেছি। করিমপুরে গিয়ে দেখি যে একটা ক্যাম্প। সেখানে আমার পরিচিত বেশ কিছু লোক। ক্যাম্পের অবস্থাটা বড় ভয়ঙ্কর খারাপ অবস্থা। জুন মাস তো মানে, যদিও তাবু আছে, অনেক লোক আছে কিন্তু বৃষ্টি হয়েছে। একটা প্যাঁচপ্যাঁচে অবস্থা। সবাইকে মানে বৃষ্টির থেকে রক্ষাও করা যায়নি। ঐ অবস্থার মধ্যেই অনেক শরনার্থীকে থাকতে হচ্ছে। পাশে একটা স্কুল আছে। এখানকার যারা কংগ্রেস কর্মী, সিপিআই, সিপিএম এর কর্মী তারাও কিছু সাপাোর্ট দিচ্ছে।
সাহায্য করছে। আমাদের যারা গেছেন তারাও করছেন। কিন্তু শরনার্থী আরও অনেক গেছে। এটা সামাল দিতে পারছে না। আমাকে একজন নেতা বললেন যে, তুমি এসেছ খুব ভাল হয়েছে। দিলীপ দা বলে আমাদের একজন নেতা ছিলেন। একজন বাম আন্দােলনের কর্মী, কুষ্টিয়া ন্যাপের কর্মী ছিলেন। আমাকে বললেন যে তুমি যখন আসছ তোমাকে দেখে একটু ভরসা হচ্ছে। তুমি দুই তিনদিন এখানে থেকে যাও। ক্যাম্পেই ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার জন্য। এত লোকজন এসেছে যে সামাল দেয়া খুব মুশকিল হচ্ছে। কোথা থেকে এসেছে, নাম কি? কতজন পুরুষ ?
কতজন মহিলা এগুলো। কয়জন শিশু। তো তাদের তো থাকার ব্যবস্থা করতে হয়। তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে হয়। তারপরে এটা নিয়ে এরা হিমসিম খাচ্ছে। তখন তো সাহায্য এত বিপুল পরিমাণে সব জায়গায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে না। তাদের বাইরের সাহায্যের চেয়েও একটা বড় সাহায্য হচ্ছে আশপাশের লোকজন। যেটা ভোলার মতো না। মানে, সাধারণ মানুষ বাড়িতে রুটি তৈরি করে, খাবার তৈরি করে নিয়ে এসে দিয়ে যাচ্ছে। এবং সেই খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এবং এদিকে রান্নাও হচ্ছে। মানে হরেক রকমের চেষ্টা, চেষ্টার কোন ত্রুটি হচ্ছে না। মানুষের ভালবাসা বা মানুষের সহানুভূতি এটার কোন কমতি নেই। কিন্তু তারপরও ম্যানেজ করা যাচ্ছে না।
তো, আমাকে দিলীপ দা বসায় দিল একটা টুলের উপরে বসায়ে ছোট্ট একটা মানে ভাঙা টেবিল যে তুমি এদের রেজিস্ট্রেশন করো। আমি তখন সেই কাজে লেগে গেলাম। কারণ, কাজটা এত জরুরি যে না বলার আমার আর কোন অবকাশ ছিল না। এবং প্রায় ৪/৫ দিন আমি এক কাপড়ে সেখানে থেকে গেলাম। রাতে কোন ঘুমানোর জায়গা ছিলনা। অনেক রাতে গিয়ে পাশে যে স্কুল, সেই স্কুলে বেঞ্চিতে ঘুমাতে হতো। তো যেহেতু জুন মাস অত ঠাণ্ডাটাণ্ডা ছিল না। কোনমতে কাটায়ে দিতাম। হাতমুখ ধুয়ে আবার সকাল বেলায় এসে যা পাওয়া যেত মুড়ি চিড়া বা বিস্কিট সেটা দিয়েই ব্রেকফাস্ট হতো। পাশেই কিছু চায়ের দোকান ছিল আগে, আরও দুই একটা চায়ের দোকান বসল।
সেখানে গিয়ে চা খেয়ে এসে আবার তিন চার দিন ঐ ভলান্টিয়ারের কাজ করলাম। কাজ করে যাই হোক মোটামুটি যখন একটু নিয়ন্ত্রণে আসল তখন আমি রানাঘাটে গিয়ে আমার বন্ধূর বাসায় গিয়ে প্রথম আমি স্নান করে একটু ফ্রেশ হয়ে তারপরের দিন আবার কলকাতায় গেলাম।
ইতিমধ্যে আমি আমার সেই চেষ্টাটা করছি। আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। আমার পার্টির নেতারা তারাও চায় যে, আমাদের কর্মীরা যারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারে। তারা মুক্তিযুদ্ধে যাক। অতএব কেউ আমাকে ডিসকারেজ করছেনা। কিন্তু আমি আমার মতোই চেষ্টা করছি যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমাদের একটা সমস্যা ছিল ওখানে আওয়ামীলীগের মধ্যে বড় রকমের রেসিস্ট্যান্স ছিল বামরা যেন মুক্তিযুদ্ধে না ঢুকতে পারে। শেষের দিকে একমাত্র মোজাফফর ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টি তাদেরকে আলাদাভাবে ব্যবস্থা করল। সেটা হচ্ছে যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনটা লাগবে সেহেতু সোভিয়েতপন্থী বলে তাদের একটা আলাদা স্পেস দেয়া হলো। কিন্তু সোভিয়েতপন্থীর বাইরে যারা ছিল তথাকথিত চীনপন্থী বা অন্য কেউ কারণ চীনপন্থীরা তো প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না। কিন্তু যারা পক্ষে ছিল তারা কমল সেনের নেতৃত্বে এরসঙ্গে প্রথম থেকেই ছিল।
অমর সেনকে তো জেল থেকে বের করা হয়েছিল ২৫ শে মার্চের আগে। অসহযোগ চলা অবস্থায়। মার্চ মাসের ২০ তারিখের পরে। তাকে জেল থেকে বের করা হলো। উনার নেতৃত্বে আমরা যারা, অমল সেনও চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রথম থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আমরা যারা গেলাম।আমাদের জন্যে কোনভাবেই কোন স্পেস হলোনা। এরমধ্যে আমার দুই একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আওয়ামীলীগ করে কিন্তু তারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দও করে। তারা আমাকে পরামর্শ দিল যে আপনার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার দরকার নেই। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া তো আরও অনেক কাজ আছে। আপনি সেগুলো করেন। আমি প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিইনি। আমি মনে করলাম যে এমনিই বলছে। পরে বুঝলাম যে আসলে তারা আমার ওয়েলউইশার হিসেবে বলছে। কারণ হচ্ছে ইতিমধ্যে আমাদের কাছে খবর আসতে শুরু করল যে কিছু কিছূ বামপন্থী কর্মী যারা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে গেছে তাদেরকে জীবন হারাতে হয়েছে। কারণ হচ্ছে ওখানে গিয়ে যেখানে ট্রেনিং হতো, সেই ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে অনেক সময় যাদেরকে কট্ট্রোর বাম বলে চিন্থিত করা হতো, তাদেরকে এলিমিনেড করা হতো।
এরসঙ্গে একটা ইন্ডিয়ান আর্মিরও কোন কোন অংশের যোগাযোগ থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত না। তবে, আওয়ামীলীগের কোন কোন কট্টোর আওয়ামীলীগের, সব আওয়ামীলীগের না, আওয়ামীলীগের মধ্যে কট্টোরপন্থী যারা ছিল তাদের ই ছিল যে, কোনভাবেই কোন বামদের অন্তর্ভূক্ত করা যাবেনা। যেটা পরবর্তী কালে মুজিব বাহিনী হিসেবে বিশেষ ভাবে এটা মুজিব বাহিনীর উপরে বর্তায়। এটার কাজই ছিল যে বামপন্থীদের থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দূরে রাখতে হবে। অতএব যদি কেউ ঢুকে পড়ে তাকে অনুপ্রবেশকারি হিসেবে এলিমিনেড করে দাও বা বাতিল করে দাও। বা তারে বিতাড়িত করো। এরকম কিছু খবর টবর পেলাম। এর কতটা সত্য, পুরোটা সত্য নাও হতে পারে। আবার পুরোটা মিথ্যা যে না সেটার প্রমাণ আমরা পরে পেয়েছি।
যে বেশ কিছু বামপন্থী কর্মী যারা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে গেছিল তারা আর ফিরে আসেনি। তবে, তারপরেও যারা একটু কম চিন্থিত তারা কিন্তু গেছে। তখন আমাদের যারা পার্টির কর্মীরা তারা কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে তখন আমাকে বলা হলো তুমি মুক্তিযুদ্ধে জয়েন করার আর চেষ্টা করোনা।
বেটার তুমি বরং যাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার মতো আগ্রহী তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে পলিটিক্যাল ট্রেনিং দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাঠাও সেটা বরং বেশি অর্থাৎ তুমি নিজে গিয়ে হয়ত তুমি নিজেই বিপদে পড়বে। তোমার নিজের বিপদটা ডেকে আনার চেয়ে বরং যে যুদ্ধ করতে আগ্রহী বা যোগাযোগের কারণে করতে পারছে না। তাকে যােগাযোগটা করে দাও। তখন আমি এই উদ্দেশ্যটাকে সামনে নিয়ে বিভিন্ন শরনার্থী ক্যাম্পটাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় শূধূ না কলকাতার বাইরে অসংখ্য ক্যাম্প। তো ক্যাম্পে ক্যাম্পে যাওয়া শুরু করলাম।
ঐ যে করিমপুরের ক্যাম্পের কথা বললাম। তো গিয়ে অনেক পরিচিত লোক পেলাম। তাদের মধ্যে যারা আছে, তাদের সাথে যোগাযোগ করে বললাম এই ভাবে এই ভাবে যেতে হবে। এবং তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে গেছে। আর একটা কাজ হলো আমরা বামপন্থীরা অনেকগুলো লিটারেচার তৈরি করলাম। কারণ মানুষের, মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের কাছে একটা জনযুদ্ধ। এইটা কয়েকজন অস্ত্রধারী যোদ্ধা যুদ্ধ করবে তা না সমস্ত জনগণের যুদ্ধ। অতএব জনগণকে তো সচেতন করতে হবে। অতএব, তাদেরকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন ধরণের লিফলেট, বুকলেট এগুলো আমাদের তৈরি করতে হলো। এরমধ্যে আর একটা কাজ হয়েছে। এটাও জুন মাসে হয়েছে। এটা আমি পৌঁছানোর আগেই হয়েছে। সেটা হচ্ছে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটা বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি বলে একটা কমিটি হলো। যে কমিটির মধ্যে এই বামপন্থী দলগুলো যারা সোভিয়েতপন্থী না বলে পরিচিত না, এই সমস্ত বামপন্থী দলগুলো ছিল।
মোজাফফর ন্যাপ তো ছিলই। যদিও মাওলানা ভাসানী নিজে অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কোন কর্মীকে দেখা করতে দিত না ভারত সরকার। তাকে আলাদাভাবে আইসোলেট করে রাখা হতো। তাকে একটা আলাদা বাসায় আইসোলেট করে রাখা হয়েছিল। ফলে, উনার নেতৃত্বেই হলো উনিও জানতেন এটা। উনার নলেজে ছিল কিন্তু উনি ব্যক্তিগতভাবে ফিজিক্যালি উপস্থিত ছিলেন না। তো, ঐ কমিটির আওতায় তখন কলকাতায় একটা দোতালা বিল্ডিং আমাদের জন্য সিপিএমের নেতৃত্বে আর একটা বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সংহতি কমিটি সম্ভবত সেটার নাম, যার চেয়ারম্যান ছিলেন জ্যোতিবসু। ঐ কমিটি আহ্বান করলেন যে একটা ব্যাপক ফান্ড কালেকশনের, মানুষের কাছ থেকে, সাহায্য করার জন্য। তারা একটা ফান্ড তৈরি করলেন। সেই তহবিল গঠন করে সেই তহবিল থেকে তখন আমাদের অর্থ সাহায্য দেয়া শুরু হলো। আমরা এই যে চলাচল করতাম। কিছু কিছু অর্থ সাহায্য আমরা ওখান থেকে পেতাম।
রবিবার তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে।
# শামসুল হুদা, উন্নয়নকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।
# সিনিয়র স্টাফ রিপাের্টার।
আরও পড়ুন : পর্ব – ১, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতীয় মুসলিমদের জানানোর কাজ করতাম আমি : শামসুল হুদা
আরও পড়ুন : পর্ব- ৪, আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : পর্ব -৩ আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : পর্ব – ১ : আমি স্বাধীন দেশ ও পতাকা দিতে পেরেছি কিন্তু গণমানুষের মুক্তি আসেনি : আবুল বাশার
আরও পড়ুন : আসলে একাত্তর সালের সময়টা মুখের কথায় বর্ণনা করা অত্যন্ত কঠিন : কামাল আহমেদ
আরও পড়ুন : রাজাকার যখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তখন খুব খারাপ লাগে : আব্দুস সামাদ তালুকদার
আরও পড়ুন : রক্ত স্রোতে পবিত্র হয়ে জন্ম নিয়েছে বাঙালি জাতির স্বাধীন বাসভূমি বাংলাদেশ : ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ
আরও পড়ুন : আমাদের মতো মানুষের কাছে একাত্তরের স্মৃতি বিবিধ : আফসান চৌধুরী
আরও পড়ুন : একদিকে বিজয়ের উল্লাস, অন্যদিকে প্রিয় দুই শিক্ষকের মৃত্যু আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল : ডা. মাগদুমা নার্গিস রত্না
আরও পড়ুন : রেডিওতে পাক-সেনাদের আত্মসমর্পণের খবর শুনে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে যাই : সাইফুল ইসলাম
লালসবুজের কথা’র ফেসবুক পেজ :
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা