মঙ্গলবার ঢাকায় শুরু হচ্ছে সম্মেলন
বিশ্বে প্রায় ১.১-২ কোটি মানুষ টাইফয়েড জ্বরে ভোগে। দক্ষিণ এশিয়ায় টাইফয়েড জ্বর একটি সাধারণ রক্ত সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ টাইফয়েড জ্বর সংক্রমণের জন্য উপযোগী, যার কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন, শহর ও গ্রামাঞ্চলের বৈসাদৃশ্য, উন্নত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগের অভাব এবং খোলা জায়গায় মল ত্যাগের অভ্যাস।
এমনই এক পরিসংখ্যান নিয়ে ঢাকায় শুরু হচ্ছে টাইফয়েড, কলেরা অপুষ্টি এবং অন্ত্রের অন্যান্য রোগ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং এসবের মোকাবেলার উপায় উত্তরণে পঞ্চদশ অ্যাসকড। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে টাইফয়েড, কলেরা অপুষ্টি এবং অন্ত্রের অন্যান্য রোগ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং এসবের মোকাবেলার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করাই এর উদ্দেশ্য। এতে অংশ নেবেন জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা । ২৮-৩০ জানুয়ারি ২০২০-এ ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে এ এসকড অনুষ্ঠিত হবে। এর আয়োজন করছে আইসিডিডিআর,বি এবং এতে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেইটস ফাউন্ডেশন। এক সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা এতথ্য জানান।
সম্মেলনে আন্ত্রিক সংক্রমণ, পুষ্টি, নীতি এবং প্রচলিত অনুশীলনের সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা হবে। এক্ষেত্রে, বর্তমান বিশ্বের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সম্মেলনে চারটি বিশেষ সিম্পোজিয়াম রাখা হয়েছে, সেগুলো হল- ক) টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন: এশিয়া ও আফ্রিকাতে ব্যবহারের সম্ভাবনা।, খ) ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরা নির্মূলকরণ: উদ্যোগ এবং চ্যালেঞ্জ।, গ) এনভায়রনমেন্টাল এন্টারোপ্যাথি, আন্ত্রিক মাইক্রোবায়োটা এবং শৈশবকালীন অপুষ্টি, এবং ঘ) অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এবং আন্ত্রিক সংক্রমণের চিকিৎসার ওপর এর প্রভাব।
২৮ জানুয়ারি তারিখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রধান অতিথি হিসেবে ডায়রিয়া ও পুষ্টি বিষয়ক এশীয় এই সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোঃ আসাদুল ইসলাম এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
১৯৮১ সালের দিকে যে সময়ে ডায়রিয়া শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল এবং মুখে খাওয়ার স্যালাইনের কার্যকারিতা সফল প্রমাণিত হলো, তখন প্রথমবারের মতো এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, এবং তখন থেকেই অ্যাসকড বাংলাদেশসহ ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ডায়রিয়াজাতীয় রোগ এখনো বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ ডায়রিয়াজাতীয় রোগে মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশিরভাগের মৃত্যুর কারণ ডায়রিয়া।
অন্যদিকে, সারা বিশ্বে ২.৬৯ কোটি অপুষ্টিতে ভোগা কৃশকায় বা উচ্চতার তুলনায় কম ওজনবিশিষ্ট শিশুদের অর্ধেকেরই বাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশ্বের খর্বাকৃতির বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাবিশিষ্ট সব শিশুদের প্রায় অর্ধেক (৪৭.২%) তিনটি দেশে বাস করে, যার মধ্যে দু’টি দেশ হল ভারত (৪.৬৬ কোটি) এবং পাকিস্তান (১.৭ কোটি)। আর বাংলাদেশে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৩১ ভাগই খর্বকায় যাদের মধ্যে ৯ ভাগ অতি খর্বকায়, এবং ৮ ভাগ কৃশকায়।
এর পাশাপাশি, বিশ্বের স্থুলকায় শিশুদের মধ্যে ৫৪ লক্ষ এবং ৪৮ লক্ষ যথাক্রমে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় বসবাস করে (মোট স্থুলকায় শিশুর ২৬.৬%)। সমগ্র অঞ্চলটি অপুষ্টির দ্বিমুখী ব্যাপকতার শিকার।
অতীতের চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষ সংঘাত, জরুরী অবস্থা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। ২০১৯ সালে ৪২টি দেশের ১৩.৪ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। ঝুঁকির মধ্যে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষ কলেরার মতো পুরাতন রোগে মারা যায়, কারণ তাঁরা নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে ভোগে। অনেক মানুষ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বা তারা বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ার কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর জন ক্লেমেন্স বলেন, “আমরা ঢাকায় পঞ্চদশ অ্যাসকড-এ মিলিত হতে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হল লক্ষ লক্ষ মানুষ যেসব বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে চলেছে তা সমাধানের উদ্দেশ্যে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান বিনিময় এবং আমাদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মকৌশলসমূহ আলোচনা ও মূল্যায়ন করা।” বিজ্ঞানভিত্তিক সেশনসমূহে এবং তার বাইরেও ১৮টি দেশের গবেষক, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, নীতি-নির্ধারক এবং স্বাস্থ্য কার্যক্রম ব্যবস্থাপক এই সম্মেলনের মাধমে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ পাবেন।
আইসিডিডিআর,বি-র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও অ্যাসকড-এর সভাপতি ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন, “এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে নবীন বিজ্ঞানী ও গবেষকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে আমরা সত্যিই অভিভূত। তিন দিনের এই সভায় ৮১টি মৌখিক এবং ১১৩টি পোস্টার উপস্থাপনা পেশ করা হবে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার ৪৫০ জনেরও বেশি সংখ্যক অংশগ্রহণকারী, এবং ৪৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতি নির্ধারক এই সম্মেলনে বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করছেন।”
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পকিল্পনা ও উন্নয়ন) এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ সানিয়া তহমিনা বলেন, “আমি মনে করি এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমরা কিভাবে আরো ভালোভাবে পানিবাহিত রোগের ব্যবস্থাপনা করা যায় তা জানতে সক্ষম হব। এখন আমাদের জন্য অগ্রগণ্য বিষয় হল ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরা রোগ নির্মূল করা এবং এই সম্মেলন অবশ্যই এই ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।”
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মেডিসিনের অধ্যাপক এডওয়ার্ড টি রায়ান বলেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ চিহ্নিতকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সম্মেলনে যোগদান করতে পেরে আমরা অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা; আইসিডিডিআর,বি-র উপ-নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মন্জুরুল ইসলাম, ও আইসিডিডিআর,বি-র সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অ্যালেন রস সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন।
দেশি বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা এই সম্মেলন আয়োজনে সহায়তা করেছেন।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা