স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতাবিধি, শিক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুর্দান্ত অগ্রগতি অর্জন করেছে। যৌথভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের করা মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) – প্রগতির পথে বাংলাদেশ- ২০১৯-এর ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এই সমীক্ষার ফলাফল সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশ করা হয়েছে।
শৈশবকালীন খর্বাকৃতির নিম্নগামী হার এর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক উন্নতিগুলোর একটি ছিল যা ২০১৩ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০১৯-এ ২৮ শতাংশে নেমে আসে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশে গত ৩০ বছরে সব ধরনের শিশুর মৃত্যুর হার (প্রসব পরবর্তী অবস্থায়, নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী) নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
অন্যান্য ইতিবাচক ফলাফলের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রাপ্যতা; টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ ও ব্যবহারের হার বৃদ্ধি; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি এবং জন্ম নিবন্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি, যা একটি শিশুর পরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করে।
একই সঙ্গে, একটি সমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্য আরও দ্রুত “মানের সঙ্গে অগ্রগতি” প্রয়োজন। শিক্ষা ও খাবার পানির গুণগত মান, শিশু বিয়ের বিরুদ্ধে লড়াই এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে বিস্তৃত “সুরক্ষামূলক” বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। অন্যদিকে, শিশুদের প্রতি সহিংস শাসন বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। পনেরো বছরের নিচে প্রতি ১০ জনে নয়জন শিশুই তাদের অভিভাবক বা সেবা প্রদানকারীদের দ্বারা কোন না কোনভাবে সহিংস শাসনের শিকার।
২০১২-২০১৩ এমআইসিএ এবং ২০১৯ এমআইসিএস-এর মধ্যবর্তী সময়ে শিশুদের জীবন মান উন্নয়নে অনেক কিছুই অর্জিত হয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যদি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যপূরণ করতে চায় তবে দ্রুত আরও কিছু করা দরকার।
এমআইসিএস ২০১৯-এর জন্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় দেশজুড়ে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে ১ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে ৬১ হাজার ২৪২ টি পরিবারের সদস্যদের করা প্রশ্নের উত্তর থেকে। এর মাধ্যমে ৬৪ জেলার সবগুলো জুড়ে পরিসংখ্যান গত নির্ভরযোগ্য উপাত্ত উঠে আসে।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর মতে, “এবারের এমআইসিএস সার্ভে থেকে পাওয়া নতুন উপাত্তসমূহ মধ্যম আয়ের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিশুদের উন্নতির জন্য উপাত্ত-ভিত্তিক জনমত ও নীতি প্রণয়নকে তুলে ধরা অব্যাহত রেখেছে।”
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অ্যালেন বালান্ডি ডোম স্যাম বলেন, “এসডিজির যে মূলনীতি – ‘কেউ পিছিয়ে পড়বে না’ – তার আলোকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ‘যারা পিছিয়ে আছে’ তাদের চিহ্নিত করতে এবং সে অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নিতে এমআইসিএস ২০১৯-এ উঠে আসা তথ্য আমাদের দারুণ ভাবে সহায়তা করবে।”
লিঙ্গ বৈষম্য ও এ সংক্রান্ত গৎ বাঁধা ধারণা ভেঙে ফেলা ও সামাজিক রীতি নীতি পরিবর্তন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ–এ কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাংলাদেশের শিশু ও তরুণদের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিলম্বের সুযোগ নেই, কেননা সুযোগের এই জানালাটি বন্ধ হওয়ার আগে হাতে আর মাত্র ১১ বছর সময় আছে।বাংলাদেশে এসডিজি অর্জন ত্বরাণ্বিত করতে সব ধরনের প্রকল্প পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা জোরদারে, অবকাঠামো নির্মাণে ও সক্ষমতা বাড়াতে বর্ধিত বিনিয়োগ অপরিহার্য।
এমআইসিএস ২০১৯-এ গুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় উঠে এসেছে এক নজরে সেগুলো হচ্ছে:
• পরিবারের গড় আকার ৪.৩। জনসংখ্যার প্রায় ৩৫.৬ শতাংশ ১৮ বছরের কমবয়সী (এমআইসিএস, ২০১৯)। গড় প্রজননের হার (২.৩) ও কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার (৮৩) গত ৫ বছর ধরে একই অবস্থায় রয়েছে।
• স্তন্যপান করা শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি (৯৮.৫ শতাংশ)।এছাড়া জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়– এমন শিশুর সংখ্যা এখনও বেশ কম (৪৬.৬ শতাংশ)।
• মাঝারি ধরনের ও মারাত্মক পর্যায়ের কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২০১২-১৩ সালের ৩১.৯ শতাংশ থেকে ২০১২ সালে কমে ২২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে, মাঝারি ধরনেরও মারাত্মক পর্যায়ের খর্বকায় শিশুর সংখ্যা ২০১২-১৩ সালের ৪২ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে ২০১৯ সালে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
• ৩৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে শৈশবকালীন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়ার শিশুর সংখ্যা খুবই কম (১৮.৯ শতাংশ), যদিও ২০১২-১৩ (এমআইসিএস) সালে নিবন্ধিত ১৩.৪ শতাংশের তুলনায় তা কিছুটা বেশি।
• প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট উপস্থিতির হার ৮৫.৯ শতাংশ, যা আগের বারের এমআইসিএস সার্ভের (২০১২-১৩) তুলনায় কিছুটা বেশি, যেখানে এই হার ছিল ৭৩.২ শতাংশ। তাসত্ত্বেও ১৩.১ শতাংশ কিশোর-কিশোরীরা নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। ড্রপ-আউট রেট বা শিক্ষা সমাপ্ত না করেই ঝড়ে পড়ার হার বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে বেশি, যেখানে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন (১৮.১ শতাংশ) শিশু নিম্ন মাধ্যমিকের বাইরে রয়েছে।
• বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের অনুপাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত (৫৬ শতাংশ) বেড়েছে।
• শিশুদের সঙ্গে সহিংস আচরণের হার আশঙ্কা জনকভাবে উচ্চই রয়ে গেছে।১-১৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৮৮.৮ শতাংশই তাদের লালন পালনকারীদের কাছ থেকে এ ধরনের সহিংস আচরণের শিকার।
• ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৬.৮ শতাংশ শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। স্কুলে যাওয়ার শিশুদের (৪.৪ শতাংশ) তুলনায় স্কুলে না যাওয়া শিশুদের (১৮.৯ শতাংশ) মধ্যে এই হার বেশি।
• শিশু বিয়ে এখনও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং বর্তমানে ১৫-১৭ বছর বয়সী ১৫.৪ শতাংশ নারী বিবাহিত। এছাড়াও ২০-২৪ বছর বয়সী ১৫.৫ শতাংশ নারীর ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয় (এমআইসিএ২০১৯)।
• প্রায় সব পরিবারের ক্ষেত্রেই (৯৮.৫ শতাংশ) খাবার পানি সংগ্রহের উৎসের উন্নতি হয়েছে। গ্রামীণ ও শহুরে পরিবারগুলোর মধ্যে এক্ষেত্রে পার্থক্য খুবই সামান্য।এরমধ্যে ৪৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী এমন এলাকায় বসবাস করে যেখানে তাদের থাকার অঙ্গনেই উন্নত খাবার পানির উৎস রয়েছে।
• বাংলাদেশের প্রায় ৮৪.৬ শতাংশ পরিবারের উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।স্বাস্থ্যকর আচরণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট জ্ঞান থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে হাত ধোয়ার অভ্যাস কমই রয়ে গেছে।
• ২-১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৭.৩ শতাংশ অন্তত একটি চিহ্নিত ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা