বাংলাদেশে পেঁয়াজ সঙ্কটের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল গত মাসের গোড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্যে।
ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ওপর দিল্লিতে এক সভায় কিছুটা রসিকতার সুরেই তিনি বলেছিলেন, “হঠাৎ করে আপনারা বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে আমরা একটু সমস্যায় পড়েছি। আমি রাঁধুনিকে বলে দিয়েছি পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করতে।”
তারপর থেকেই পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। কেজি-প্রতি ২০০ টাকা হওয়ার পর অনেক পরিবারই পেঁয়াজের ব্যবহার অনেক কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে: পেঁয়াজ যদি চাল-ডালের মতো অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য না হয়, তাহলে পেঁয়াজ বাদ দিয়ে কি প্রতিদিনের রান্নাবান্না চলে না?
ইউটিউবে খুবই জনপ্রিয় একটি রান্নার চ্যানেল পরিচালনা করেন রুমানা আজাদ। তিনি বলছিলেন, পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার কথা বাঙালিরা চিন্তাও করতে পারেন না।
“মা-খালাদের রান্না দেখে দেখে আমাদের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে পেঁয়াজ ছাড়া কোন তরকারি রান্না সম্ভব না। বিশেষভাবে মাংস ও মাছ রান্নায়” বলছিলেন তিনি, “আদা, রসুন হয়তো বাদ দেয়া চলে, কিন্তু পেঁয়াজ থাকতেই হবে।”
পেঁয়াজের প্রতি গৃহিণী আর রসনা-বিলাসীদের এত পক্ষপাতিত্বের কারণ তার বিশেষ স্বাদ এবং গ্রেভি বা ঝোল তৈরিতে পেঁয়াজের বিশেষত্ব। কাঁচা মাংস কিংবা মাছের মধ্যে পেঁয়াজের রস ঢুকে তার স্বাদকে আরও বাড়িয়ে দেয় বলেই পেঁয়াজের এত কদর, বলছিলেন রুমানা আজাদ।
সব দোষ পেঁয়াজের?
কিন্তু তিনি জানান, বাঙালী রান্নায় বিশেষভাবে মাংসের ডিশ তৈরি করতে গিয়ে এতটাই কষানো হয় যে পেঁয়াজের দ্রব্যগুণ বলে আর কিছু থাকে না।
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাঙালী রান্নায় সাধারণত যে উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার করা হয় তাতে পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে পেঁয়াজের বেশি বেশি ব্যবহার স্বাদের ক্ষেত্রে বিশেষ কোন তারতম্য ঘটাতে পারে না বলে তারা উল্লেখ করছেন।
রুমানা আজাদ বলছেন, অথচ বাঙালিদেরই একটা বড় অংশের রান্না ঘরে পেঁয়াজ ঢোকা নিষেধ।
“আমি আমার ইউটিউব চ্যানেলের জন্য বেশ কিছু ডিশ তৈরি করেছি কোন রকম পেঁয়াজ ব্যবহার না করে,” তিনি বলছেন, “কিন্তু সেই ডিশের স্বাদ কোন অংশেই কম ন।”
পেঁয়াজের ধুসর ইতিহাস
বাঙালির পেঁয়াজ-প্রীতির কারণ যেমন ব্যাখ্যাতীত, তেমনি পেঁয়াজের ইতিহাসও কুয়াশার চাদরে ঢাকা।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে ইরান, পশ্চিম কিংবা মধ্য এশিয়াকে পেঁয়াজের উৎপত্তিস্থল বলে দাবি করা হয়।
তবে এর ব্যবহার যে প্রাচীন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
খৃষ্টের জন্মের ৫০০০ বছর আগে চীনে এর ব্যবহার ছিল।
প্রাচীন মিশরেও রাজার দেহ মমি করার আগে চোখের কোটরে পেঁয়াজের বিচি ঢুকিয়ে দেয়া হতো বলে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
তবে পেঁয়াজের উপকরিতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
ভেষজ-শাস্ত্রে পেঁয়াজের গুণগান করা হয়েছে। এটি যৌন-ক্ষমতা এবং কাম-বৃদ্ধি করতে পারে বলে এর নানা রকমের ওষুধি ব্যবহার রয়েছে।
একই কারণে দেহ শীতল রাখার স্বার্থে হিন্দু বিধবাদের জন্য পেঁয়াজ রসুন পরিহার করার উপদেশ দেয়া হয়েছে।
“রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহার নেই, বাঙালি একথা ভাবতেই পারে না। এটা আমাদের খাদ্য-সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ,” বলছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আইনুন নাহার।
তিনি ব্যাখ্যা করছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহারের ফলে বিশেষ গোলাকৃতি এই সবজিটি বাঙালির রান্না একটি বাধ্যতামূলক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
“দেখবেন, তরকারিতে পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়নি, এটা বলে না দিলে আপনি সহজে টের পাবেন না,” অধ্যাপক নাহার বলেন, “আবার যে মুহূর্তে আপনি জানতে পারবেন রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়নি, তখন আর তরকারিটি আগের মতো মজা লাগবে না।”
পেঁয়াজের অনাগত ভবিষ্যৎ
কিন্তু পেঁয়াজের আন্তর্জাতিক বাজারের টালমাটাল অবস্থার ফলে কি বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটতে পারে? কিংবা পেঁয়াজের ব্যবহার কমে আসতে পারে?
রুমানা আজাদ মনে করেন, বাঙালিরা ঐতিহ্যগতভাবে যেসব রান্না জানে, তাতে বড় কোন ধরনের পরিবর্তন মেনে নিতে চায় না। মাংসের ডিশে থকথকে গ্রেভি তৈরির জন্য পেঁয়াজের বদলে আলুর পেস্ট, কালো জিরা, পাঁচ ফোড়ন, সরষে বাটা কিংবা পোস্ত বাটার ব্যবহারে আগ্রহী হবে এমন লোকের সংখ্যা কমই, বলছেন তিনি।
“পরিবর্তন যদি ঘটেও সেটা এক প্রজন্মের ব্যাপার হবে না। পরিবর্তনটা হয়তো ঘটবে খুবই ধীরে। কয়েক জেনারেশন ধরে এটা ঘটতে পারে,” বলছেন অধ্যাপক আইনুন নাহার।
“পেঁয়াজের দাম আগেও বেড়েছে। আমার মাকে দেখেছি তখন রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার করতেন কম। কিন্তু একেবারে বন্ধ করে দেননি কখনই।”
আর সে কারণেই বোধহয় বাঙালির রসুইখানায় পেঁয়াজের দাপট টিকে থাকবে দীর্ঘদিন।বিবিসি বাংলা।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা