ফজলুল বারী
শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতারা অবাক এলোমেলো কথাবার্তা বলছেন! আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদের বললেন ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন ৩০ জানুয়ারিই হবে! নির্বাচন নিয়ে কোন রকম বাড়াবাড়ি না করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ছেলেরা নির্বাচন পিছানোর আন্দোলন করছে এটি উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের যে সব নেতাকর্মী হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তা করতেই পারে। ওবায়দুল কাদেরের মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখে এ ধরনের বক্তব্যে চমকে যেতে হয়। কারন ভোট কবে হবে না হবে এটি ঠিক করে, করবে নির্বাচন কমিশন। ওবায়দুল কাদের এটি বলার কে? আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আন্দোলন করছে? ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেনও ওবায়দুল কাদেরের কাছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী? শাসকদলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি, আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক যখন প্রধানমন্ত্রীর নাম করে এ ধরনের বানী দেন তাহলে নির্বাচন কমিশন-বিচার বিভাগ কি বার্তা পায়? কিতাবে যাই থাকুক বাংলাদেশের আবহাওয়া বুঝেশুনে চলারতো অলিখিত এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা দেখান বুদ্ধিমানরা।
আওয়ামী লীগের চেনা একটি ভোট ব্যাংক দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব স্বরস্বতী পুজার দিন ভোট করে ফেলবো এমন বক্তব্য যখন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের মুখে ঔদ্ধ্যত্ত্বের উচ্চারনে শোনা যায়, তখন দেশের ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষজন চমকে যান-হতাশ হন। প্রশ্ন ওঠে এই যদি হয় আওয়ামী লীগের চলতি দৃষ্টিভঙ্গি হয় তাহলে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে দলটিকে নির্ভর করে তাহলে তারা যাবে কোথায়? অতঃপর হাওয়া বুঝে একদিন পরে এসে এবাউটঠার্ন ঘুরে গিয়ে ওবায়দুল কাদের বললেন, নির্বাচন পিছাবে কিনা এটি ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন। এটা নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার। তারা যদি নির্বাচন পিছায় তাহলে আওয়ামী লীগ আপত্তি করবেনা। শাসকদলের সাধারন সম্পাদক যখন একেকদিন একেক ধারায় কথা বলেন তা কেমন দেখায়? এ যাত্রায় বেঁচে গেলো মিডিয়া! কারন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মুখস্ত অভ্যাস হলো বিপদে পড়লে মিডিয়ায় তাদের বক্তব্য ঠিকমতো আসেনি, বিকৃত করা হয়েছে বলে অজুহাত দেখায়!
স্বরস্বতী পুজার দিন সিটি নির্বাচনের জেদাজেদি নিয়ে এখন পর্যন্ত যা হলো তাতে আওয়ামী লীগের ক্ষতিই হলো। মুজিব বর্ষের ঢামাডোলের মধ্যে সবাই দেখলো ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ তার হিন্দু ভোটারদের আবেগকে খুব কমই পাত্তা দেয়! কারন কমিশন শুরু থেকে বলে আসছে তারা সরকারি ক্যালেন্ডার দেখে ৩০ জানুয়ারি ভোটের তারিখ ঠিক করেছে। সরকারি ক্যালেন্ডারে ২৯ জানুয়ারিকে স্বরস্বতী পুজার দিন দেখানো হয়েছে। ঈদ যেমন চাঁদ দেখে হয় পুজার দিনও ঠিক হয় তিথি দেখে, এটি তারা মানতে নারাজ। শুরু থেকে পুজা নিয়ে একদিন এককথা বলেছে কমিশন! বলেছে পুজা আর ভোট দুটিই পবিত্র। দুটি একসঙ্গে চলতে সমস্যা নেই। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে আগের দিন থেকে যে ১৪৪ ধারা জারি হবে, ওই পরিস্থিতিতে ভোট কী করে সম্ভব, তা নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেনি। অনেকে তাই বলছেন নির্বাচন কমিশনের ভিতরে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে বিরক্ত-বিক্ষুদ্ধ করতে চালবাজি করলো কীনা সেটিও ভেবে দেখলোনা শাসক দল!
এর কিন্তু সুযোগ ঠিকই নিচ্ছে তাদের প্রতিপক্ষ! বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন বললেন পুজার দিন কেনো ভোট হবে। নির্বাচন কমিশনের এটি ভাবা উচিত। ইশরাক পুরনো ঢাকায় হিন্দু ভোটারদের সেন্টিমেন্ট ভালো জানেন। বিএনপির আরেক প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেছেন, পুজার দিন ভোট করার প্রতিবাদ হিসাবে হিন্দু ভোটাররা যেন বিএনপিকে ভোট দেয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিক-তাপসও বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ছাত্রদল পুজার দিন ভোট প্রতিহত করতে বলেছে। আর আওয়ামী লীগ দেখালো তারা দোদুল্যমান! একদিন এক কথা! পুজার দিন ভোটের বিরোধিতার আন্দোলনের নেতৃত্ব শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের হাতে ছিল। ওবায়দুল কাদেরের এলোমেলো কথাবার্তায় তারাও হতোদ্যম হন। এরমাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের কাছে অনশনের যোগ দিয়েছেন অনেক ছাত্র শিক্ষক। হিন্দু জোট নামের একটি সংগঠন নির্বাচন বর্জন করে সেদিন ঢাকায় ঘটপুজায় সামিল হতে ঢাকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আহবান জানিয়েছে। ২০০১ সালে ভোটের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হামলার প্রতিবাদে এমন ঘটপুজার ডাক দেয়া হয়েছিল।
এই সিটি নির্বাচনের শুরু থেকে এলোমেলো কথা বলে আসছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। শুরুতে ওবায়দুল কাদের বলেন, এই নির্বাচনে হারলে আওয়ামী লীগের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়বেনা। কারন সিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয়না। যে কোন দল জয়ের আশায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের মুখে শুরুতেই পরাজয়ের বানী কেনো তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির মহাসচিব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারলে আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসাবে তিনি কেনো পারবেননা। বিএনপির মহাসচিব এমপি-মন্ত্রী কিছুই নন। এমপি-মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মুখে তাই কথাটি শিশুতোষ শোনায়।
নির্বাচন কমিশনের বিধিতে সাফ উল্লেখ করা আছে এমপিরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারনা বা কোন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেননা। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে দুই সিটি নির্বাচনের প্রচার সমন্বয় কমিটি গঠনের ঘোষনা দেয়! মন্ত্রীত্ব যাবার পর এই দু’জনের হাতে কোন কাজ নেই। আওয়ামী লীগের এপ্রোচে মনে হচ্ছিল এদের কিছু কাজ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে শুরুত্বেই বেঁকে বসে নির্বাচন কমিশন। তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এসেও মিডিয়াকে বিভ্রান্ত করেন তোফায়েল আহমদ! তিনি বলেছেন এমপি হিসাবে তারা মাঠে ময়দানে ভোট চাইতে পারবেননা। কিন্তু অফিসে বসে নির্বাচন সমন্বয় করতে পারবেন! কিন্তু নির্বাচন কমিশন সাফ জানিয়ে দেন এমপি হিসাবে আমু-তোফায়েল অফিসে বসেও নির্বাচনের প্রচার সমন্বয়ের কাজ করতে পারবেননা। এ বিষয়গুলো সবার জানা। কিন্তু কেনো শাসকদল বিষয়টি নিয়ে শিশুতোষ আচরন করলো এর জবাব নেই। এরপর আর কাউকে আমু-তোফায়েলের জায়গায় নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়নি। ওবায়দুল কাদের বললেন, প্রচার তৎপরতার জন্যে আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজের দুই মেয়র প্রার্থীরাই যথেষ্ট। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন নিয়ে কী আওয়ামী লীগ কোন কারনে নার্ভাস? নার্ভাসরা কিন্তু এমন এলোমেলো আচরন করেন। এমনিতে প্রচারে তাদের দুই মেয়র প্রার্থী আতিক-তাপস ভালোই করছেন। এখন পর্যন্ত একদিনও মনে হয়নি প্রচারে তারা পিছিয়ে আছেন।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা