ভোট দেবার পর মাকসুদা বেগম। ছবি : তাসকিনা ইয়াসমিন।
ফজলুল বারী
আমার জীবনের প্রথম দেয়া ভোটগুলো জাল ভোট ছিল। সেটা ছিল জিয়ার হ্যাঁ-না ভোট। আমি তখন স্কুলে পড়তাম। সেই কেন্দ্রে কোন ভোটার না যাওয়ায় আমাদের টিচাররা আমাদের সেখানে ভোট দেয়াতে নিয়ে যান। আমি ও আমার সহপাঠী বন্ধুদের বলা হয়েছিল সেই কেন্দ্রে ভোট হয়েছে তা দেখাতে না সামরিক শাসক জিয়া তাদের চাকরি খেয়ে ফেলবে। এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। সেদিন মোট কতোটা ভোট দিয়েছিলাম তা সঠিক মনে নেই। একশোর মতো ভোট হতে পারে। কম বা বেশিও হতে পারে। টিচাররা মুড়ি ছিঁড়ে হ্যাঁ সিল মারতে বলেছেন! আমরা স্যারদের কথা শুনে সেগুলো বাক্সে ভরেছি। তখন বিষয়টা অপরাধ কিনা তা জানতামনা। যখন ভালো-মন্দ জানতে শুরু করি তখন সে ভোটের জন্যে আমার অনেক লজ্জা ও ঘৃনাবোধ হয়েছে। প্রথমে সেই টিচার-স্যারদের আমি মনের থেকে ঘৃনা করতে শুরু করি। এরপর ঘৃনা করতে শুরু করি জেনারেল জিয়াকে। জেনারেল জিয়ার প্রতি আমার কৈশোরের জাল ভোটের ঘটনার সেই ঘৃনাবোধ আজও বহাল আছে। কারন তার জন্যে আমার সময়ের কিশোরদের দিয়ে জাল ভোট দেয়ানো হয়।
সাংবাদিকতা পেশায় এসে আমি শুধু একবার শুধু ভোট দিতে পেরেছি। ভোট না দিতে পারার কারন ভোটের দিন পত্রিকার এসাইনমেন্টে আমাকে এমন সব এলাকায় চলে যেতে হয়েছে আমি যেখানকার ভোটার নই। যে বার ভোট দিতে পেরেছিলাম সেবার ইস্কাটন লেডিস ক্লাব সেন্টারে সাংবাদিক নির্মল সেনকে ভোট দিয়েছিলাম। উল্লেখ্য ঢাকার জীবনে আমি প্রথমে মগবাজারের দিলু রোড এবং পরে নিউ ইস্কাটন রোড এলাকায় থাকতাম। ভোটার ছিলাম সে এলাকারই। নির্মল সেনকে ভোট দিলে তিনি জিতবেননা জানতাম। তাও দিয়েছিলাম। কারনটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের। তাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। তিনিও আমাকে খুব ভালোবাসতেন। সেই নির্বাচনে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের প্রার্থী নির্মল সেন পাঁচশ’র কিছু বেশি ভোট পান। সেই ভোটগুলোর মধ্যে আমারও একটি ভোট ছিল। সেই ভোটের স্মৃতিটি এখনও মধুর হয়ে আছে।
দেশে ভোট এলেই যখন সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করা হয় তখন আমার ২০০১ সালের নির্বাচনের কথা মনে পড়ে। সেদিন মুন্সিগঞ্জ শহরের নির্বাচন কভারের জন্যে আমার এসাইনমেন্ট ছিল। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম সেনাবাহিনীর লোকজন সেদিন সারা শহরে শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খুঁজছিল। অথচ সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র দখলে নেয়া বিএনপির ক্যাডারদের তারা দেখেও না দেখার ভান করছিল! অতএব সেই নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছিল নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হলেও তাদের সে রকম একটি বার্তা দিয়ে দেয়া হয়। এরজন্য সেনাবাহিনীকে বিতর্কের বাইরে রাখতে তাদের নির্বাচনী দায়িত্বে না জড়ানোই ভালো। মেয়র হানিফ যে বছর নির্বাচিত হন সে ভোটের পরদিন বিএনপির ক্যাডাররা ব্রাশ ফায়ার করে সে সাতজনকে হত্যা করেছিল ভোটের সেই বীভৎস স্মৃতি ভুলতে পারিনা। দেশে থাকতে সর্বশেষ নির্বাচন কভার করেছিলাম চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচন। বিএনপি আমলের সেই নির্বাচনে মীর নাসির উদ্দিনের পক্ষে তারেক রহমান সহ বিএনপির হেভিওয়েটরা প্রচারনা চালান। তাদের বিরুদ্ধে ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে বিজয়ী হন চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
২০০৭ সাল থেকে আমি বিদেশে। সে কারনে দেশের আর কোন নির্বাচন আমার আর চাক্ষুষ দেখা হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের রেজাল্ট দেখেছি টেলিভিশনে। ভোট দেখিনি। সিডনির যে বাসায় বসে একটি লেপটপে সে রেজাল্ট দেখি সেখানে বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী ছিলেন। ভোটের ফল দেখে তারা স্তব্দ-বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭০’র নির্বাচনের পর সেই নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় পায়। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমার একটি ক্ষোভ আছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যত নির্বাচন হয়েছে এর সবগুলো নির্বাচনে বিজিতরা কারচুপির অভিযোগ করে ভোটারদের অপমান করেছে। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জিতে এসে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ২০০১ সালে ভালো মানুষি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে এসে আওয়ামী লীগ যে অভিজ্ঞতা পায় তা তারা আর ভুলতে পারেনি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় ফিরে এসে হাওয়া ভবন করে খালেদা জিয়ার দুই ছেলে এতো বেশুমার চুরি চামারি করেছে যে ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে জবরদস্তিমূলক নির্বাচন করার চেষ্টা করতে গিয়ে দেশে ১/১১ আসে। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের পর সব মহলের বিপুল অংশগ্রহনে আর কোন নির্বাচন হয়নি। ২০০১ সালের অভিজ্ঞতায় আওয়ামী লীগও বাতিল করেছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। আন্দোলন করে বিএনপিকে বাধ্য করেছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপি তা পারেনি।
এখন ভোট মানে আওয়ামী লীগ-বিএনপির কৌশলের খেলা! আওয়ামী লীগ এমন সব কৌশল খেলে যে বিএনপি রাগ করে ভোট ছেড়ে চলে যায়। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রতিহত করতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা এমন সন্ত্রাস করে যে তা নিয়ে দেশজুড়ে ভীতির অবস্থার সৃষ্টি হয় এই কৌশলে রাজনীতির মাঠ থেকে পিছিয়ে পড়ে বিএনপি। জামায়াতকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে এর পাপতাপ ধারন করে বিএনপি তাদের প্রতি অনেক সহানুভূতিকে ধংস করে। এরপর থেকে বিএনপি মূলত একটি অভিযোগ পার্টি। আওয়ামী লীগ এই দেয়না সেই দেয়না, এই মারে সেই মারে। অথচ বিরোধীদলে থাকতে বিএনপির সকল নিগ্রহ মোকাবেলা করে মাঠের লড়াইয়ে টিকে থেকে ভোটের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। অভিযোগ পার্টি বিএনপি সব নির্বাচনের দুপুরে নির্বাচন বর্জন করে চলে গিয়ে তাদের ব্যাপারে নতুন আরেক নেতিবাচক ভাবমূর্তির সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটেছে। এরজন্যে এই নির্বাচনে বিএনপিকে বারবার করে বলতে হয়েছে এবার আর দুপুর বেলা নির্বাচন বর্জন করে চলে যাবোনা। মারলেও না।
এবার ভোটের প্রচারনাটি দেখে মনে হয়েছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা বিপুলভাবে মাঠেময়দানে বেরিয়ে এসেছে। বিএনপি নেতারা এটিকে বলেন গণজোয়ার। এটি গণজোয়ার হিসাবে ভাবতে ভালো লেগেছে এই ভেবে যে তাহলো ভোটকেন্দ্রগুলো অন্তত ভোটারবিহীন খা খা করবেনা। কিন্তু নির্বাচনের দিন টিভিতে ভোটকেন্দ্রগুলোয় ভোটার উপস্থিতি দেখে হতাশ হতে হয়েছে। এটি তাহলে কী ধরনের গণজাগরন? আপনারা নিজের দলের নেতাকর্মীদের যদি প্রচারে নামাতে পারেন, তাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে পারবেননা কেনো? আবার অভিযোগমালা! এই বাধা দিয়েছে সেই বাধা দিয়েছে! এই মেরেছে সেই মেরেছে! মিয়ারা আত্মজিজ্ঞাসা করুন। যখন কারও পক্ষে সত্যিকারের গণজাগরন ঘটে তাহলে কেউ তাদের দাবায়া রাখতে পারেননা। বলা হয়েছে ভোটকেন্দ্র পাহারায় রাখা হবে! সেই পাহারা কোথায়? আবারও বলি গণজাগরন ঘটলে কেউ কাউকে দাবায়া রাখতে পারেনা। নির্বাচনের দু’তিন দিন আগে থেকে হঠাৎ দেখা গেলো বিএনপির বন্ধু ছোটদলের বড়নেতা আ স আব্দুল রব-মান্নাগং নীরব! কোথাও কেউ নেই! তারা কী বিএনপির অবস্থা বুঝতে পেরে সরে গেছেন? না সরকারের বিরুদ্ধে নতুন শব্দমালা লিখতে-অনুসন্ধানে ব্যস্ত?
ভোটের সারাদিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কোথায় ডুব মেরেছিলেন? না ঢাকায় তারা বহিরাগত হিসাবে র্যাবের হুমকিতে ঘর থেকে বেরুননি? ভোটটা নিয়ে একটি আক্ষেপ থেকে গেলো। কারন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে ফেরেননি। আসলে নিজেদের জীবন সংগ্রাম ফেলে দেশের রাজনীতির কাইজ্জ্যার পার্ট হতে দেশের মানুষের আগ্রহও এখন কম। সরকারকে নিজের অবস্থানে কংক্রিট মজুবত অবস্থায় দেখে মানুষও হয়তো বুঝেছে নির্বাচনে বিএনপি জিতেই বা কী করবে। সরকারেরতো বুড়িও ছুঁতে পারবেনা। ভোটের দিন বাংলাদেশে যানবাহন বন্ধ থাকে! বাড়তি রিকশাভাড়া গুনে মানুষ আর এই আনাস্থার হাটে যাবার উৎসাহ পায় না।
অস্ট্রেলিয়ায় ভোট না দিলে জরিমানা হয়। এরজন্যে আমরা অনেকেই আগেভাগে ভোট দিয়ে রাখি। জরিমানা এড়াতে পোস্টাল ব্যালট, আর্লি ভোট সেন্টারের মাধ্যমে ভোট দিয়ে রাখেন বেশিরভাগ মানুষ। বাংলাদেশের ভোটারদের ভোটে ফেরাতে সে ব্যবস্থার কথা হয়তো চিন্তা করতে হবে। বাংলাদেশের মতো মিটিং মিছিল হয়না অস্ট্রেলিয়ায়। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও ভোট চাননা। ভোট হয় জাতীয় রাজনীতির মতামত-অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে। ভোটের তফসিল ঘোষনার পর সব ভোটারের কাছে পাঠানো হয় পোস্টাল ব্যালট। পোস্টাল ব্যালটের ওপর লিখা থাকে দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্যে আপনার ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ন। নির্বাচনের এক দুই সপ্তাহ আগে থেকে বিভিন্ন এলাকায় খোলা হয় আর্লি ভোট সেন্টার। ডাকযোগে অথবা সে কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমেও অনেকে ভোট দিয়ে রাখেন আগেভাগে। কারন যথাযথ কারন দেখাতে না পারলে ভোট না দিলে এদেশে জরিমানা দিতে হয়। কে হায় জেনেশুনে এমন জরিমানা দিতে ভালোবাসে।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা