ফজলুল বারী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাসের মহামারী পরিস্থিতির কারনে খাদ্যপন্য মজুদ না করার জন্যে দেশের মানুষকে আহবান জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন এতে করে নিম্ন আয়ের মানুষজনের সমস্যা বাড়ে। কারন তাদেরতো সামর্থ্য কম। বাংলাদেশে অবশ্য এসব আহবান খুব বেশি মানুষ আমলে নেয়না। খোঁজ নিয়ে দেখুন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রী এসব আহবান শোনেননি। যে যেভাবে পারছেন কিনেছেন অথবা এখনও কিনছেন। করোনা পরিস্থিতি যেহেতু বিশ্বজনীন সংকট, তাই পন্যের বাজারে এর প্রভাব সব জায়গাতেই পড়েছে। এমনকি এর রেশ পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও।
এতোদিন আমি আমার বন্ধুদের একটা কথা বেশ বড়াই করে বলতাম তাহলো, ঈদে-চান্দে অস্ট্রেলিয়ায় দ্রব্যমূল্য বাড়েনা। বরং কমে। ক্রিসমাস-বক্সিং ডে উপলক্ষে চলে কম লাভে বেশি বিক্রির প্রতিযোগিতা। করোনা পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার সুপারমার্কেটগুলোতে নানা পন্যের সংকট হয়েছে, কিন্তু মূল্য বাড়েনি। কিন্তু মূল্য বেড়েছে বাংলাদেশি দোকানগুলোয়। বিশেষ করে চাউল তেল, মাংস সহ নানান ভোগ্যপন্যের দাম বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশিরা নিজস্ব নানান ভোগ্যপন্যের জন্যে এসব বাংলাদেশি গ্রোসারী স্টোরের ওপর নির্ভরশীল। মূলত ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা বাসমতি চালের ভাত খান অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশিরা। এতোদিন এসব বাসমতি চালের পাঁচ কেজি চালের ব্যাগ ১০ ডলার থেকে ২০ ডলারে বিক্রি হতো। এখন এমন সব চালেরই দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে আসে মূলত পোলাওর চাল। এখানে সারা বছরই বাসমতির চালের চেয়ে পোলাওর চালের দাম কম। করোনায় যখন খদ্দেররা চাল সহ নানান খাদ্য সামগ্রীর জন্যে দোকানগুলোয় ভিড় করেন তখনই সরবরাহ নেই বলে বাংলাদেশ স্টাইলে অনেক পন্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সুপারমার্কেটগুলোয় দাম না বাড়িয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবস্থা করা হয় রেশনিং’এর।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমন ঠেকাতে পরিচ্ছন্নতা জরুরি এই খবরটি চাউর হবার পর অস্ট্রেলিয়ার সুপারমার্কেটগুলোতে প্রথমেই টয়লেট টিস্যু, হ্যান্ড টাওয়েল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এসবের সংকট দেখা দেয়। কারন এরা টয়লেটে এশীয়দের মতো বদনা-পানি ব্যবহার করেনা। আমার এক যুগের অস্ট্রেলিয়ার জীবনে এর আগে কখনো দেখিনি কোন পন্য মুহুর্তের মধ্যে সব কাড়াকাড়ি বিক্রি হয়ে রেক খালি হয়ে যাচ্ছে। এই করোনা সেটা দেখিয়েছে! সুপার মার্কেটগুলোর টয়লেট টিস্যু, হ্যান্ড টাওয়েল এর মতো সামগ্রীর রেকগুলো এখনও খালি। সে এলাকায় ঝুলছে দূঃখপ্রকাশের নোটিশ।
আগে অস্ট্রেলিয়ার সুপারমার্কেটগুলোর পার্সোনাল কেয়ার এলাকায় নানান বাহারি নামের হ্যান্ড সেনিটাইজার, হাত ধোয়ার জেল সহ নানাকিছু পাওয়া যেতো। গত বেশ কিছুদিন ধরে এগুলোর রেকগুলোও খালি। বাংলাদেশের লোকজন সাধারনত হালাল-হারাম জ্ঞানে সুপার মার্কেটগুলোর মাংস খান না। এই মাংসের প্রতিদিনের সরবরাহও ফুরিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও কোন সুপার মার্কেটে এসব পন্যের দাম বাড়েনি। সুপার মার্কেটওয়ালারাই টয়লেট টিস্যুর মতো সামগ্রী বিক্রি করছে রেশনিং’এর মাধ্যমে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সরবরাহ এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
অনেক এলাকার সুপারমার্কেটে সকাল সাতটায় তাদের স্টোর খোলার পর প্রথম এক ঘন্টা শুধু পেনশনারদের ঢুকতে দেয়া হয়। এর কারনে সকাল সাতটার আগেই পেনশনারদের লাইন পড়ে এসব সুপারমার্কেটের পার্কিং’এ। সকালের প্রথম এক ঘন্টা শুধুমাত্র পেনশনার কার্ড দেখেই তাদের ঢুকতে দেয়া হয়। সেখানেও সবাইকে লাইনে রেখে একজনকে দেয়া হয় একেকটি টয়লেট টিস্যুর প্যাকেট। এসব একেক প্যাকেটে ২৪ টি করে টয়লেট টিস্যুর রোল থাকে। পেপার টাওয়েল একেকজন দুটি করে প্যাকেট একসঙ্গে কিনতে পারেন।
কিন্তু চলতি সংকটেও কোন সুপার মার্কেটে ফলমূল, শাক-সব্জি, দুগ্ধজাত পন্য, রুটি-জেলি এসবের কোন সংকট হয়নি। তবে ইদানিং আমি যখন বিভিন্ন এলাকার কোন সুপারমার্কেটে ঢুকি তখন এশীয় খাবার এলাকায় ঢু মারলে বিশেষ কিছু পন্যের সংকট টের পাই। তাহলো তেল-লবন-আটা সহ এশীয়রা যা বেশি খায় সে রেকগুলো খালি। জিজ্ঞেস করলে সংক্ষেপে জবাব দেবে সোল্ড।
এমন অনেক দিন ঘুরে যখন কোথাও লবন পাচ্ছিলাম না তখন এমন একটি স্টোরে কাজ করে এমন একজন বাংলাদেশি ছাত্র কাজ করে তার সহায়তা নিতে হয়েছে। আমরা সাধারনত তেল-চিনি-লবন-দুধ এসব সুপারমার্কেট থেকে কেনার চেষ্টা করি। কারন এ পন্যগুলোর দাম বাংলাদেশি দোকানের চাইতে সুপারমার্কেটে কম। এমনকি বিভিন্ন রকম ডাল-ছোলা-মশলার প্যাকেটও এখন সুপারমার্কেটগুলোয় তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।
করোনা মহামারীর এই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের বিশেষ একটি সংকট যা বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে একেবারেই পৃথক। বাংলাদেশে রোগটি পৌঁছেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে। আর অস্ট্রেলিয়ায় এটি প্রমোদ তরীর মাধ্যমে বেশি ছড়িয়েছে। জাহাজে করে এক-দুই সপ্তাহের ভ্রমন, এক দেশ থেকে আরেকদেশে, এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে ঘুরে বেড়ানো এসব প্রমোদতরীতে ভ্রমন পিয়াসীদের মধ্যে পেনশনার বুড়োবুড়িদের সংখ্যা বেশি। করোনা ভাইরাস তাদেরকে কাবু করছে বেশি।
জাপানের টোকীয় বন্দরে থাকা করোনায় আক্রান্তদের প্রমোদতরী থেকে অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশ উদ্ধার করে নিয়ে যায় যার যার নাগরিকদের। এদের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় রোগটি ছড়িয়েছে বেশি। এখনও বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ক্রুজে আটকা পড়া আছেন প্রায় তিন হাজার অস্ট্রেলিয়ান। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সাগরে ভাসমান ক্রুজগুলো নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমে। জার্মান পর্যটকে বোঝাই এমন একটি ক্রুজে থাকা মুমুর্ষ একজন করোনা রোগীকে মানবিক কারনে পার্থের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বাকি জার্মান পর্যটকদের জার্মান দূতাবাসের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। উল্লেখ্য অস্ট্রেলিয়ার সীমান্ত এখন বিদেশিদের জন্যে বন্ধ। পরিস্থিতি সামাল দিতে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যও পরষ্পরের মধ্যে সীমান্ত বন্ধ করেছে। এখন বিদেশ থেকে কোন অস্ট্রেলীয় নাগরিক দেশে ফিরলে তাদের বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারিন্টানে কোন হোটেলে থেকে এরপর বাড়ি যাবার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। দাবানলের পর অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপক চেপে ধরেছে করোনা সংকট। বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের মুখের দিকে তাকানো যায়না। কারন এরমাঝে তাদের বেশিরভাগ চাকরি হারিয়েছে।
করোনা পরিসংখ্যান এর লাইভ আপডেট দেখুন
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা