আনন্দ আর কষ্টে মোড়ানো বিজয় দিবস!
তাসকিনা ইয়াসমিন
আমরা যারা ঢাকা শহরে বড় হয়েছি। একাত্তর দেখেছি, আমাদের কাছে একাত্তরের স্মৃতি বিবিধ। আমাদের কাছে এককভাবে কোন স্মৃতি আসেনা। যেমন ঢাকা শহরের মানুষের কাছে যেটা খুব বড় হয়ে আসে, একদিন ছিল বিজয়ের মাস। অন্যদিন কিন্তু ১৪ই ডিসেম্বরের পরে। ১৪ ডিসেম্বরে যে হত্যাকান্ড হয়, বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ড, এটা কিন্তু বিশাল একটা বোঝার মতো মানুষের উপরে নেমে এসেছিল। আজকে আমি গেছিলাম বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। ওখানে আমি ফলকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ওই স্মৃতিগুলো খুব কষ্টের নয়, ভয়াবহ বটে!
আমার কাজ করতে গিয়ে আমি যখন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এভাবে কথা বলেছি। তখন দেখেছি যে, অনেকগুলো বিবিধতা রয়েছে। ঢাকার বাইরের তিনটা ঘটনা আমি উল্লেখ করব।
এক. আমার সঙ্গে কথা হচ্ছিল সিপাহী নান্নু মিয়ার সঙ্গে। উনি ১৬ তারিখে ঢাকা শহরে প্রবেশ করেছিলেন। ১৬ তারিখ সম্পর্কে নান্নু মিয়া বলছিল, ওরা যখন আদমজী দিয়ে ঢুকছে। তখন পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করছে। বিভিন্ন যায়গায় সারেন্ডার চিত্র রয়েছে। একটা যায়গা থেকে পাকিস্তান আর্মিদের যখন নিয়ে যাচ্ছে, তখন চোখ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। তখন তাদের সাথে ৭/৮টা মেয়ে ছিল। মেয়েগুলো নিজেদের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করছে। বাংকার থেকে নিয়েছে বা অন্য কোন যায়গা থেকে নিয়েছে। সিপাহী নান্নু মিয়া একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছিল। এবং ঐ রাতেই বিদ্রোহ করে সে যুদ্ধ যোগদান করেছিল। সিপাহী নান্নু মিয়া বলছে যে, ‘এই মেয়েগুলো যাইব কই? এই মেয়েগুলিকে তো কেউ নিবও না। এদের তো কোন ঘরও নাই। সংসার তো গেছেই। কোথাও যাইতে পারব না। আমার কাছে সে যখন বলছিল ঘটনাটা তখন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মেয়েগুলো কোথায় গিয়েছিল? তখন উত্তর দিয়েছিল কইতে পারুম না! কইতে পারব না স্যার।’ তবে, আমার কাছে মনে হয় এই মানুষগুলোকে আমরা উহ্য রেখে দিই। আমাদের বিজয়ের আনন্দের কথা বলতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, যে মানুষগুলােকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে এই মানুষগুলোকে হয়ত, যে কোন কারণেই হোক পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে ছিল। তাদের যে লজ্জা, তাদেরকে কোন যায়গা দেয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিল? ছিল না। বস্তুতপক্ষেই এই ক্ষমতা ছিল না। এটা বাড়াবাড়ি করে বলে লাভ নেই যে, আমাদের দেশের যে নারী পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে সময় কাটিয়েছে তাকে আমরা একসেপ্ট করব। কি পরিস্থিতি কি অবস্থার মধ্যে সে নারী সময় কাটাতে বাধ্য হয়েছে, তার যৌন সঙ্গী হতে বাধ্য হয়েছে এটা কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না। এখানে আমার কাছে এই দৃশ্যটা বড় করে মনে হয়, অতগুলো মেয়ে। লোকজন দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। টিটকারি দিচ্ছে। থুথু মারছে- নান্নু মিয়ার মুখে । আমাদের বইয়েও নান্নু মিয়ার মুখের কথাগুলো আছে। অতএব, এটা হচ্ছে আমার কাছে ডিসেম্বর। রাস্তায় রাস্তায় জয়বাংলা স্লোগান দিতে দিতে সত্যি মানুষ যাচ্ছে। মানুষ জয়বাংলা বলছে। ইন্ডিয়ান আর্মি হাঁটছে। জয়বাংলা বলছে এটা ১৬ তারিখে।
দ্বিতীয় হচ্ছে, ১৬ তারিখে পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করলেও বিভিন্ন যায়গায় পাকিস্তান আর্মি ছিল। এমনকি ঢাকা শহরেও ছিল। আমার একটা ইন্টারভিউ আছে যেখানে হায়দার আকবর খান রনো’র মা উনি ইন্টারভিউ দিচ্ছিলেন। যে কিভাবে নয়টা মাস পার করেছেন। এবং সেদিনও একজন কাছের আত্মীয়, পরিচিত মানুষ গিয়েছিল। একটা পাকিস্তান আর্মি এরমধ্যেও তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। অর্থাৎ ডিসেম্বর মানেই একেবারে স্বাধীন হয়ে গেছে। নিরাপদ হয়ে গেছে তা না। অনেকগুলো ছোট ছোট পকেটে বিভিন্ন যায়গায় ছিল। একইসাথে ১৬ই ডিসেম্বরের সুযোগ নিয়ে বহু নিরীহ নিরপরাধ মানুষের উপর অত্যাচার হয়েছে। আমরা যারা কিছুটা সবল প্রকৃতির আমরাও কিন্তু ওই নিরীহ মানুষদের বাঁচানাের জন্যেও আমাদের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। আমাদের ১৬ তারিখের পর থেকে। এবং এটা কিন্তু আমাদের, এটা আমরা স্বীকার করতে চাই না কিন্তু আমাদের ১৬ তারিখ থেকেই কিন্তু বিপদ শুরু হয়ে গেছে। এবং যারা সমাজবিরােধী মানুষ তারা সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে। অতএব, এটাও কিন্তু আমার স্মৃতির অংশ।
তৃতীয়ত, আমি, একটা মানুষের কথা বলি, এবং এটা আমার কাছে মনে হয় যে, একাত্তরের শৌর্য বীর্য্যের কথাই তো মানুষ বলে। শৌর্য বীর্য্যের কথায় বলি – হাবিলদার আওলাদ নামে একজন মানুষ। সে চিকনাগুল বলে সিলেটে একটা যায়গা আছে, সেখানে কর্ণেল দত্তের অধীনে যুদ্ধ করছিল। তো চিকনাগুল সেক্টরে ওরা কিছুতেই পাকিস্তান আর্মির একটা মেশিন গানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ওরা গুলি করেই যাচ্ছে। তখন, সি আর দত্ত আমাকে বলছে, তখন হাবিলদার আওলাদ কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেই তার বীরত্বের জন্য তার প্রমোশন পেয়েছে। হাবিলদার আওলাদ তখন তিন চারজনকে নিয়ে একটা যায়গা থেকে সরে গিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে। এরমধ্যে তিন চারজনের মধ্যে হাবিলদার আওলাদ একটা পর্যায়ে বলল এভাবে যুদ্ধে জেতা যাবে না। বলে, হাবিলদার আওলাদ বন্দুকটা ধরে হাঁটা শুরু করল। ঠিক হাঁটা না সে দৌড়াতে শুরু করল। সে দৌড়াচ্ছে। গুলি খাচ্ছে, সে এগুচ্ছে। গুলি খাচ্ছে, আগাচ্ছে, আবার গুলি খাচ্ছে। (আমার চোখে তার চেহারা ভাসে।) শেষ পর্যন্ত সে গিয়ে পাকিস্তান আর্মির মেশিনগানটাকে সে ধ্বংস করে দিল। কিন্তু হাবিলদার আওলাদ মারা গেল। শহীদ হলো। আমরা যেইভাবে বলি যে, সুইসাইড এ্যাটাকার। হাবিলদার আওলাদ যদি পৃথিবীতে সুইসাইড এ্যাটাকার হয় নিজের দেশের জন্যে এরচেয়ে শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ আর হয়না।
শেষ আর একটা ঘটনা বলে শেষ করব। ১৬ তারিখে একটা যায়গা, সেটার নাম বলার দরকার নেই। ওইখানে রাজাকাররা একটা ছেলেকে মেরে ফেলেছিল। ১৬ তারিখে যখন ওর বন্ধুবান্ধবরা ওর মাকে এসে বলেছে যে, এরকম মেরে ফেলেছে। তখন খুব ঠান্ডা মাথায় বলল, আমাকে তাহলে একটা দাও দে। তখন ওকে একটা দাও দিল। এবং এর সঙ্গে যারা জড়িত তারাই আমাকে এগুলো বলেছিল। এরপর ওই লোকটাকে গ্রামের মানুষ বা গ্রামের যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সশস্ত্র ভাবে জড়িত ছিল তারা কিন্তু ওখানে গিয়ে ওকে ঘিরে রইল এবং ঐ লোকটাকে মাঝখানে ফেলে দিল এবং দাওটা দিয়ে ঐ মহিলাকে বলল, আম্মা এবার আপনি যা করতে চান করেন। ওই মহিলা একজন যে সেখানে উপস্থিত ছিল বলল যে কয়েকঘন্টা ধরে কুপিয়েছে। অতএব, আমার মনে হয় যুদ্ধের যেই বিবিধতা যুদ্ধের যে বিভিন্ন রকম ডাইমেনশন আছে এটা আমাদের একটু স্মরণ করা উচিত।
১৬ তারিখে মানুষ রাস্তায় দৌড়েছে, আত্মীয় স্বজনকে খুঁজতে। ১৬ তারিখে নিরাপরাধ মানুষ বাঙালি তো গেছেই। অনেক বিহারীও মারা গেছে। যাদের কোন দোষ ছিলনা। কিন্তু যুদ্ধ এমন একটা ভয়াবহ জিনিস যে যুদ্ধের আগুন কাউকে রাখেনা। আমি মনে করি বাংলাদেশের মানুষের গবেষণাটা করা উচিত। এই কারণে এই যে হাজার হাজার তথ্য, হাজার হাজার ঘটনা এগুলোতো কেউ সংরক্ষণ করিনা। আমরা অল্প কিছু সংরক্ষণ করে ওটাকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করতে চেষ্টা করি। আমার মনে হয় এই পরিসর থেকে সরে না আসলে আমাদের একাত্তর জানা হবে না।
# আফসান চৌধুরী, লেখক, সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, শিক্ষক-ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
: তাসকিনা ইয়াসমিন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, লাল সবুজের কথা ডটকম।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা