তখন সবে মাত্র সাংবাদিকতায় এসেছি। রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিজলী পত্রিকার চিলমারী উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করি। নিয়মিত খবর সংগ্রহ করতে চিলমারীর অন্য সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার খুব চেষ্টা করি। কিন্তু গাজী নজরুল ইসলাম সাবু আর শ্যামল কুমার বর্মন ছাড়াও প্রায় দেড় ডর্জন খানিক সাংবাদিক ছিল। যারা আমাকে পাত্তাই দিত না। কারন, তাদের তুলনায় আমি অনেক নবীন। আর বিশেষ কারন হলো তারা সবাই কোন কলেজের প্রভাষক আবার কোন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকও বটে। আর আমি মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দেব। কিন্তু তারা পাত্তা না দিলেও আমি সহজেই হাল ছেড়ে দেই নি। কারন, আমার মনে প্রবল ইচ্ছে সাংবাদিকতা শেখার।
চিলমারীর সিনিয়র সাংবাদিকদের এমন আচরনে কিছুটা কস্ট পেলেও মনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতাম সবকিছু। আর খুঁজতে থাকি কার কাছে গেলে শিখতে পারবো। একদিন রংপুরে দৈনিক বিজলী পত্রিকার অফিসে গেলাম। ওই অফিসের কম্পিউটার অপারেটর লিচু ভাই আমাকে ডেকে তার পাশের চেয়ারে বসালেন। জানতে চাইলেন আমার সর্ম্পকে। তিনিও কিছু গল্প শোনালেন। গল্পের এক পর্যায়ে বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক কুড়িগ্রাম বার্তা কি আপনি পড়েন? আমি বললাম পত্রিকাটি মাঝে-মধ্যে পড়ি। ওই পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশকের বাড়ি চিলমারী। আর পত্রিকারটির যিনি বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন, তার নাম এস এম নুরুল আমিন সরকার। তার কাছে গিয়ে পরিচয় দেন। তিনি সহযোগীতা করলে আপনি আরো ভাল লিখতে পারবেন।
আমার ক্ষুর্ধাত্ব মন তার প্রস্তাবকে লুফে নিলো। চলে এলাম বাড়িতে। পরের সপ্তাহে বালাবাড়িরহাট স্টেশনে ট্রেনে চেপে কুড়িগ্রাম যাই। শহরের কলেজ মোড়ে সাপ্তাহিক কুড়িগ্রাম বার্তার অফিস। অফিসে ঢুকেই পরিচয় দিয়ে সামনের চেয়ারে বসি। আলোচনা শুরু হয় দু জনের মধ্যে। অনেক সময় পর তিনি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করেন। এক পর্যায়ে তিনি আমার বড় ভাই হিসেবে সর্বাত্বক সহযোগীতার আশ্বাস দিলেন। এবার লেখালেখি পুরোদমে শুরু হলো আমার। চিলমারী উপজেলা মোড়েই একটি অফিস নিয়ে আমরা ক জন বসতে শুরু করি।
গাজী নজরুল ইসলাম সাবু দৈনিক কুড়িগ্রাম খবরে লেখেন আর শ্যামল কুমার বর্মন লেখেন সাপ্তাহিক কুড়িগ্রাম বার্তায়। অফিসে মাঝে-মধ্যে বসেন চিলমারীর প্রথম ও প্রবীন সাংবাদিক এম এ আই লাল মিয়া। উনি অফিসে বসলেই প্রতিদিনের প্রকাশিত খবর নিয়ে আলোচনা হত। কিছু সময়ের জন্য আড্ডা বেশ প্রাণবন্ত হত। একদিন সকালে আমি অফিস খুলে বসেছি। হঠাৎ বিএনপির কয়েকজন নেতা এসে অফিসের সামনে দাঁড়ালেন। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ৩/৪ জন নেতা আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে গালাগালি শুরু করলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এরমধ্যে একজন পা দিয়ে জোড়ে টেবিলে লাথি মারলেন। আর আমাকে ধমক দিয়ে বললেন-এই অফিস কে চালায়? আমি বললাম গাজী নজরুল ইসলাম সাবু। কুড়িগ্রাম বার্তায় কে লেখেন? আমি বললাম শ্যামল কুমার বর্মন দাদা। এবার আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন ওই হিন্দু শ্যামল কই। এমন নিউজ করার সাহস পেল কোথায়? শ্যামলকে আজ বের করে দিতে হবে চিলমারীতে কোন কোন পরিবার পতিতার সাথে জড়িত। এখনই ডেকে নিয়ে আয় তোর সাবু আর শ্যামলকে। নইলে অফিস আজ উড়ে যাবে। আমি ভয়ে কাঁপতেছিলাম। এমন সময়ে সাবু এসে হাজির। সাবুকে ঘিরে সবাই তখন বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করে। আর আমি অফিস থেকে বের হয়ে উপজেলা পরিষদের ভিতরে গেলাম শ্যামল দাদার কাছে।
আমার কাছ থেকে শ্যামল দাদা এমন খবর শুনে বেশ ঘাঁড়বে গেলেন। কারন এমন নিউজ তিনি করেন নাই। তাহলে কেমনে ছাপা হলো। এ নিউজ সর্ম্পকে জানার জন্য পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এস এম নুরুল আমিন সরকারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার জন্য উপজেলা পরিষদের দেয়াল টপকিয়ে রওয়ানা দিলাম। কারন গেট দিয়ে বেরুলেই ওদের রোষানলে পড়তে হবে। টেলিফোন অফিসে গিয়ে দেখি শাহজামাল ভাই বসে আছেন। পাশে অনেক লোক। কারো লাইন পাওয়া যাচ্ছে, আর কারো পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু শাহজামাল ভাই আমাদের লাইন দ্রুত করে দিলেন। শ্যামল দাদার কথা হলো নুরুল আমিন ভাইয়ের সাথে। এরই মধ্যে খবর পেলাম অফিসের সামনে অপেক্ষারত নেতারা আরো উত্তেজিত। শ্যামল দাদাকে পেলে মারধর করবেন। এ খবর পাওয়ার পর শ্যামল দাদা আর আমি টেলিফোন অফিস থেকে বের হয়ে কুড়িগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। গা ঢাকা দেয়ার জন্য। তবে সোজা পথে নয়। গ্রামের পথে।
টেলিফোন অফিসের সামন থেকে আর্দশবাজার হয়ে উমানন্দ। সেখানে সাংবাদিক নীতেন্দ্র নাথ কে বিষয়টি অবগত করি। এরপর আবার রিক্সা করে উলিপুর। সেখান থেকে চলে গেলাম কুড়িগ্রাম কলেজ মোড় সাপ্তাহিক কুড়িগ্রাম কার্যালয়ে। বার্তা সম্পাদক নুরুল আমিন আমাদের দেখে বেশ চিন্তিত। তার কাছে গিয়ে জানতে পারি আরো অনেক ঘটনা। শ্যামল দাদার সাথে আমাকেও খোঁজার জন্য তারা টেলিফোন অফিসেও গিয়েছিল। না পেয়ে ঘুরে গেছে। আমার অপরাধ শ্যামল দাদাকে পালাতে সহযোগীতা করেছি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত চিলমারী। সন্ধ্যায় নুরুল আমিন ভাই শ্যামল দাদা আর আমি গেলাম দৈনিক কুড়িগ্রাম খবরের অফিসে সম্পাদক ছানালাল বকসীর সাথে সাক্ষাত করতে । শাপলা চত্ত্বরে খবরের অফিসে গিয়ে দেখি ছানালাল বকসীর সাথে আলোচনা করছেন সাপ্তাহিক গণকথার সম্পাদক অধ্যাপক মো. লিয়াকত আলী। তাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে চিলমারীতে ব্যাপক উত্তেজনা নিয়ে।
দলীয় নেতারা সাংবাদিক শ্যামল আর ফারুককে খুজঁছে। এরমধ্যে আমরা হাজির। আমাদের দেখে ছানালাল বকসী মুঁচকি হাসি দিয়ে বললো-অপরাধীরা পালিয়ে এসেছো না। আচ্ছা ফারুক ছেলেটা কে? আমি তো এ পেশায় নতুন না চেনারই কথা। নুরুল আমিন ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছানা দাদা হেসে বললেন, তুমি পারবে এ পেশায় কিছু করতে। কারন তোমার সাহস আর বুদ্ধি আছে। শ্যামল দাদাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোর তো বিপদ আছে। কারন তুই হিন্দু। আপাতত চিলমারী যাওয়ার দরকার নেই। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে চিলমারী যাবে। এরপর আমাদের সামনেই ছানা দাদা চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানার ওসির সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। এরপর কিছু শলা পরার্মশ করে ফিরে আসি কুড়িগ্রাম বার্তায়। রাতে অফিসের পেছনেই নুরুল আমিন ভাইয়ের থাকার রুমেই তিনজন ঘুমাই। পরদিন সকালে চিলমারী থেকে কুড়িগ্রাম বার্তা অফিসে ফোন আসে। সেই ফোনে জানতে পারি পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত।
দলীয় নেতারা নিউজটাকে ভিন্নভাবে বুঝিয়ে জনমত পক্ষে নেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে। আবার উপজেলা পরিষদ মোড়েই আনুষ্ঠানিকভাবে পত্রিকাটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনার পর নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা শুরু করি। এ ঘটনার কলকাঠি কে নাড়ছেন? অনেকগুলো ইস্যু সামনে নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করি। ইস্যুর সুত্র ধরে সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তির কাছের লোকদের সঙেও কথা বলি। এক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রমানপত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন একজন সাংবাদিক। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের অপর একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। তাছাড়া যে নেতারা অফিসে হামলা করেছেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছেন, তারা জানেনও না পত্রিকায় কি নিউজ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই সাংবাদিক নিজ দায়িত্বে ওই নেতাদেরকে জানিয়েছেন। ওই নেতাদের মধ্যে কয়েকজন কয়েকমাস পরে আমাকে বলেছেন, ওই সাংবাদিক নিজেই আমাদেরকে উস্কানী দিয়েছেন। আর পত্রিকায় কিভাবে অগ্নিসংযোগ করতে হবে, সেটাও ওই সাংবাদিকের পরিকল্পনা অনুয়ায়ী হয়েছে। আমি তার দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
লেখক-সিনিয়র সাংবাদিক কবি ও কথাসাহিত্যিক
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা