ফজলুল বারী : সিডনির নরওয়েস্ট এলাকায় আমি কাজ করি। এটি একটি নতুন গড়া এলাকা। বাড়িঘরের স্থাপনায় সে প্রমান দেখা যায়। এদেশে প্রায় সবার গাড়ি আছে। আপনার বাড়ির টিভি-ফ্রিজ যেমন বিলাস সামগ্রী নয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গাড়িও এদেশে একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা। নরওয়েস্ট এলাকায় বাস চলে কিন্তু ট্রেন নেই। নতুন গড়া এলাকার মাটির নীচ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় মেট্রো ট্রেন। নরওয়েস্ট এলাকায় আমার কাছে নতুন যে সব বাংলাদেশি ছাত্র দেখা করে আসেন তারা এমন মেট্রো ট্রেন চড়েই আসেন। একদিন এক বাংলাদেশি প্রিয় প্রজন্ম আমার কাছে এসে বেশ উৎসাহের সঙ্গে বলে, ভাই দারুন একটা গাড়িতে এলাম। যে গাড়িতে কোন চালক নেই। বাংলাদেশে ঢাকায় এখন মেট্রো ট্রেন চালুর কাজ চলছে। ছেলেটিকে মজা করে জিজ্ঞেস করি, ঢাকায় মেট্রোতে কী চালক থাকবেনা? ছেলেটিও মজা করে জবাব দেয়, কী যে বলেন ভাই, বাংলাদেশের মেট্রোতে হেলপারও থাকবে! বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট আনন্দের রিপোর্ট টিভি চ্যানেলগুলোয় দেখতে দেখতে কথাটি মনে পড়লো।
কারন ডিজিটাল বাংলাদেশের এরমাঝে নানান অগ্রগতি ঘটলেও দেশটার নানান কর্তৃ্ত্ব কিন্তু এনালগ লোকজনের হাতে। ইভিএম নিয়ে যত বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নানা তত্ত্ব পড়ছি তত তাদের অতীত মনে পড়ছে। কারন এই সেই দেশ, ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশের তথ্য বিদেশে পাচার হয়ে যেতে পারে এই আশংকায় দেশটার নেতৃত্ব এক সময় সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ নিতে রাজি হয়নি। বাংলাদেশে যখন রঙিন টিভি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয় তখন একদলতো বিশেষ ক্ষেপে গিয়েছিলেন! তারা বলতে শুরু করেন বাংলাদেশের মানুষ গরিব, রঙিন টেলিভিশন তাদের জন্যে একটি বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। অনেক কষ্টে তখন এনালগ মানুষগুলোকে বোঝাতে হয়েছে, একদিন সাদাকালো টিভি চলে যাবে জাদুঘরে, রঙিন টিভি হবে সস্তা। সেই সময় অবশ্য ঢাকাই চলচ্চিত্রও বানানো হতো সাদাকালোতে। বিধবাকে পরানো হতো হলুদ শাড়ি! কারন হলুদ রঙটা সাদাকালো ছবিতে ধবল সাদা দেখায়। এক পর্যায়ে আংশিক রঙিন ছবি বানানো শুরু হয় । গানের দৃশ্যগুলো রঙিন করা হতো। ধীরে ধীরে ছবি বিশেষন হতে শুরু করে সম্পূর্ণ রঙিন ছবি। আর আজকালতো সাদাকালো ছবি বলে কিছু নেই। সব ছবিই রঙিন।
এনালগ যুগের আরও কিছু গল্প বলে মূল প্রসঙ্গে আসি। দেশে আমি একটি পত্রিকায় কাজ করতাম। এক নির্বাচনের আগে রিপোর্টারদের জন্যে দুটো লেপটপ কেনার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয় একটা লেপটপ থাকবে শেখ হাসিনার মিডিয়া টিমের সঙ্গে। খালেদা জিয়ার মিডিয়া টিমের সঙ্গে থাকবে আরেকটি লেপটপ, যাতে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার-ফটোগ্রাফার স্পট থেকেই রিপোর্ট ছবি পাঠিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু চীফ রিপোর্টারের বিরোধিতায় সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। কারন সেই চীফ রিপোর্টার ছিলেন এনালগ। কম্পিউটার চালাতে জানতেননা। আজকের যুগের রিপোর্টারদের কাছে এমন গল্প আষাঢ়ে গল্প মনে হতে পারে। পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পনের দৃশ্য খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম থেকে লাইভ সম্প্রচারের জন্যে সিঙ্গাপুর থেকে একদল সম্প্রচার কর্মীকে ভাড়া করে আনা হয়। কারন বাংলাদেশের কাছে তখনও এসব প্রযুক্তি এবং এত চ্যানেলও ছিলোনা। কিন্তু সেই দলটি অনুষ্ঠানের আগের দিন মহড়ার সময় বিপাকে পড়ে যায়। ছবি তারা আপলোড-ডাউনলোড করতে পারছিলোনা। কারন তাদের যন্ত্রপাতি ডিজিটাল আর বাংলাদেশের টেলিফোন প্রযুক্তি তখনও সব এনালগ। অতঃপর তারা তাদের সম্প্রচার যন্ত্রপাতি এনালগে কনভার্ট করে সেই অনুষ্ঠান লাইভ সম্প্রচার করতে পেরেছিল।
আমরা রিপোর্টাররা তখন সাদা কাগজে হাতে লিখে ফ্যাক্সে রিপোর্ট পাঠাতাম। পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যুতের অবস্থা তখন খুবই নাজুক ছিল। চট্টগ্রামের হাটহাজারি থেকে নিয়ন্ত্রন হতো পার্বত্য অঞ্চলের বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা। অন্ধকার শহরের হোটেলে বসে মোমের আলোয় রিপোর্ট লেখা গেলেও বিদ্যুৎ ছাড়াতো ফ্যাক্স পাঠানো যায়না। তাই কতোদিন যে হাটহাজারির বিদ্যুতের লোকজনকে পরিচয় দিয়ে ফোন করে আকুতি জানিয়ে বলতে হয়েছে, প্লিজ পাঁচ মিনিটের জন্যে বিদ্যুৎ দিন। অন্তত ফ্যাক্সটা পাঠাই। ফ্যাক্স পাঠানোর পর বিদ্যুৎ আবার চলে গেছে। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা প্রায় নানাকিছু নিয়ে হা-হুতাশ করে! তারা আমাদের সময়ের সংগ্রাম জানেনা। ইভিএম বিরোধীদের ওয়ালেটে কী ব্যাংক কার্ড থাকে? এই ব্যাংক কার্ডও কিন্তু হ্যাক হয়। এরজন্যে কী আমরা ব্যাংক কার্ড ব্যবহার বন্ধ করে দেই? প্রযুক্তি ব্যবহার করতে করতে তা সবার আয়ত্বে আসে। আপনি যদি শুরুই করতে না দেন তাহলে তা আয়ত্বে আসবে কী করে?
ইভিএম এর পক্ষে লিখলে একদল জানতে চান অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনে কী ইভিএম ব্যবহার হয়? উত্তরটি হলো ‘না’। কারন অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশের ভোটার ভোট দিয়ে দেয় আগেভাগে। এদেশে যেহেতু ভোট না দিলে জরিমানা হয় সে জন্যে ভোট আগেভাগে দেবার বিষয়ে উৎসাহ দেয় নির্বাচন কমিশন। ভোটের তফসিল ঘোষনার পর সব ভোটারের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়। যাতে ভোটের সময় কাজ বা ব্যস্ততা যাদের থাকতে পারে তারা আগেভাগে ভোট দিতে পারে। পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে যে ঠিকানা লেখা ফিরতি খাম থাকে এরজন্যে এটি ফেরত পাঠাতে ভোটারদের কোন ডাক খরচও দিতে হয়না। এ দেশে শনিবার দেখে ভোটের তারিখ ঠিক হয়। এর আগে এলাকায় এলাকায় স্থাপন করা হয় আর্লি ভোট সেন্টার। জরিমানা এড়াতে সেগুলোয় গিয়েও লোকজন আগেভাগে ভোট দিয়ে ফেলেন বলে আড়াই কোটি জনসংখ্যার দেশে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ নেই। বাংলাদেশে ভোটারই ১১ কোটির বেশি। ভোটের খরচ-সময় কমাতে তাই ইভিএম এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রচলন জরুরি।
এখন ই-পাসপোর্ট প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশ সরকার সরকারি অফিসগুলোর মতো পাসপোর্ট, বিমান বন্দরের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারেনি। পাসপোর্ট অফিস আর বিমান বন্দরের দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে এই ই-পাসপোর্টের সুফল পাওয়া যাবেনা। অস্ট্রেলিয়ায় পাসপোর্ট অফিসে মূলত বিদেশিরা যায়। নাগরিকরা পাসপোর্টের আবেদন নির্ধারিত ফী সহ পোষ্ট অফিসে জমা দেয়। পাসপোর্ট ছবি তোলার ব্যবস্থা আছে পোস্ট অফিসেই। পোষ্ট মাস্টার যেমন আবেদনপত্রটি পড়ে সবকিছু ঠিক আছে কিনা দেখে তা সত্যায়িত করেন, ছবিও তিনি তোলেন। দশ কার্য দিবসের মধ্যে পাসপোর্ট চলে আসে পোষ্ট অফিসেই। আর ই-পাসপোর্ট হাতে নিজে নিজে চেকইন করা যায় বলে লাগেজ জমা দেবার পর ই-গেটই আমাদের দেখে, আর কেউ নয়। কাজেই বাংলাদেশে যদি পাসপোর্ট অফিসকে, বিমান বন্দরকে দুর্নীতিবাজ-এনালগ লোকজন মুক্ত করা না যায় এই ই-পাসপোর্টের সুফল পেতে সময় লাগবে। দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ায় দেশবাসী ও প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন।
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা