অনলাইন ডেস্ক
ড্রামের গায়ে লেখা থাকে ‘মেইড ইন ইউএই’। সাগরপথে আসা এসব বিটুমিন পৌঁছে যায় দেশের আনাচকানাচে। শেষে এর প্রলেপ পড়ে সড়ক থেকে মহাসড়কে। আমদানিকারকরা দাবি করেন, আরব আমিরাত থেকে উৎপাদিত এই বিটুমিন খুবই মানসম্মত, কোনো ভেজাল নেই। কিন্তু খাঁটি তথ্য হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) কোনো ধরনের বিটুমিন উৎপাদনই করে না, নেই কোনো বিটুমিন উৎপাদনের কারখানা। অনুসন্ধানী তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান থেকে সাগরপথে আমিরাতের বন্দরে নোঙর করে বিটুমিনের জাহাজ। বিটুমিনের সব কিছু ইরান থেকেই প্রস্তুত হয়ে আসে। বাকি থাকে লেবেল লাগানোসহ বিটুমিনে ভেজাল বানানোর কাজ। একেকটি জাহাজ আমিরাত উপকূলে নোঙর করে, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিটুমিনের সঙ্গে কেরোসিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল-আবর্জনা মেশানোর কর্মযজ্ঞ। পর্যায়ক্রমে লেবেল লাগানোসহ ভেজাল বানানো। এরপর বাকি আনুষ্ঠানিকতা সেরে সেগুলো পুনর্যাত্রা করে বাংলাদেশের গন্তব্যে। আর আমিরাতে উৎপাদিত খাঁটি বিটুমিন পরিচয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হচ্ছে লাখ লাখ টন নিম্নমানের ভেজাল বিটুমিন। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকা দেশ ইরানে উৎপাদিত বিটুমিন আমিরাত হয়ে বাংলাদেশে কিভাবে আসছে? কিভাবে বিটুমিনের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে নিম্নমানের বিটুমিন দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে সেসব তথ্য-প্রমাণসহ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম ব্যবহার করে নানা কৌশলে নিম্নমানের বিটুমিন আসছে বাংলাদেশে। ফলে রাস্তাগুলো টিকছে না। এক রাস্তা বারবার মেরামত করতে হচ্ছে। এতে গচ্চা যাচ্ছে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা। বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়াও বলেছেন, বিটুমিন আমদানির প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। যেখানে পদে পদে মানহীনতার ঝুঁকি আছে, সেই আমদানিকে নিরুৎসাহ করার পক্ষে মত তাঁর।
অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়ে ইউএইভিত্তিক বিটুমিন রপ্তানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ঢু মারি। প্রতিষ্ঠানটির নাম গ্লোবাল ইনফিনিটি জেনারেল ট্রেডিং এফজেডই। ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, ২০১২ সাল থেকে ‘গ্যালাক্সি এনার্জি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত। বিটুমিন রপ্তানির দিক থেকে নিজেদের দুবাইভিত্তিক নেতৃত্বদাতা দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে, বছরে প্রায় দুই লাখ টন বিটুমিন উৎপাদন করছে তারা।
এরপর বিটুমিনের ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে। বিক্রয় বিশেষজ্ঞ ও হিসাব ব্যবস্থাপক টিনা তাঘাভি তুলে ধরলেন তাঁদের ‘উৎপাদিত’ বিটুমিনের মান, দর এবং আনুষঙ্গিক তথ্য। ৮০ থেকে ১০০ গ্রেডের বিটুমিন কিনতে চাইলে তিনি এর দাম জানান টনপ্রতি ১৭০ ডলার। ওয়েবসাইটে নিজেরা উৎপাদন করে দাবি করলেও টিনা জানালেন, ইউএইয়ের কোথাও তাঁদের বিটুমিনের কোনো প্লান্ট নেই। মূলত প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে তাঁদের চাহিদামতো বিটুমিন আসে। ইরানের আল আব্বাস পোর্ট থেকে বিটুমিনের জাহাজ সরাসরি এসে ভেড়ে ইউএইয়ের জেবেল আলী পোর্টে।
টিনার সঙ্গে কথা হয় রবিবার (২৩ মে) সকালে। তিনি জানান, তাঁদের ব্র্যান্ডের নিবন্ধন দুবাইয়ে এবং এই শহরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অফিসও আছে। বিটুমিন বিক্রয়, লেনদেন ও রপ্তানি সংক্রান্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় দুবাইয়ে। ওই শহরে প্রতিষ্ঠানের গুদামও রয়েছে। কিন্তু তাঁরা বিটুমিন উৎপাদন করেন না। পণ্যটি আসে ইরান থেকে। দুবাইয়ে শুধু লেবেল লাগানোর কাজটি হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তিনি কয়েকটি এলসির নথি দেখান কালের কণ্ঠকে, যে এলসির অধীনে এরই মধ্যে বাংলাদেশে তাঁরা ইরানি বিটুমিন রপ্তানি করেছেন। এমনকি বাংলাদেশের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের ব্যাবসায়িক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন টিনা। অবশ্য তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এদিকে ইউএইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট সূত্রও নিশ্চিত করে বলেছে, দেশটি বিটুমিন উৎপাদন করে না। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিটুমিনের চালান সে দেশে ঢোকার পর সেগুলো রিফাইন করা হয়। তারপর তা বিভিন্ন দেশে পুনরায় রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। কনস্যুলেট সূত্র জানায়, আবুধাবি, হামরিয়াহ উন্মুক্ত জোন, ফুজাইরাহ এবং আজমানে রিফিলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউএই থেকে বিটুমিন বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। আরব আমিরাতে একটি বিটুমিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমিরাতে বিটুমিন তৈরির কোনো কারখানা নেই কিংবা রিফাইনারি নেই। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইরান থেকে চোরাই পথে আমিরাতে বিটুমিন আনা হয়। সেই বিটুমিন বিভিন্ন মোড়কে আরব আমিরাতের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে বিটুমিন সরবরাহ করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ থেকে আনা বিটুমিনগুলো সেখানে ড্রাম কিংবা বাল্কে ভরে রপ্তানি করা হয় অন্যান্য দেশে। দাম কমানোর জন্য সেখানে বিটুমিনের সঙ্গে মেশানো হয় অন্যান্য উপাদান। একে তো বাতাস ঢুকে বিটুমিনের মান আরো খারাপ হয়, তার ওপর ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর কারণে সেগুলো আলকাতার চেয়েও খারাপ হয়ে যায় বলে মনে করেন যোগাযোগ ও বিটুমিন বিশেষজ্ঞরা।
বিটুমিনের গ্রেড নির্ধারণ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো রাস্তার ধারে যদি একটি বিটুমিনের ড্রাম ফেলে রাখা হয়, কিছুদিন পর দেখবেন সেটি শক্ত হয়ে গেছে। বাতাস ঢুকলে বিটুমিনের মান পরিবর্তন হবেই। এ জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো বিদেশ থেকে না এনে যদি দেশেই উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, সেখান থেকে সরাসরি এনে যথাযথ মান ঠিক রেখে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যবহার করা যায়, তাহলেই বিটুমিনের রাস্তা টিকবে।
তাঁর পরামর্শ, ২০৪১ সালের উন্নত দেশের উপযোগী রাস্তা নির্মাণে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বাড়াতে হবে দেশি আন্তর্জাতিক মানের বিটুমিন উৎপাদন। আর সেটি দেশে সম্ভব বলেও মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘আবুধাবিতে এত তেল নেই। সেই হিসাবে আশপাশের কোনো দেশ নিম্নমানের বিটুমিন ছেড়ে দিচ্ছে। সেগুলোই আমাদের দেশে ঢুকছে। তার মানে আন্তর্জাতিক বাজার এবং বিটুমিনের সরবরাহ নিয়ে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কেনাবেচা হওয়ায় এর মূল উৎপাদক দেশও চিহ্নিত করা যায় না।’ তিনি বলেন, মধ্যস্থতা করার কারণে শুধু খরচই বাড়ছে না, বিটুমিনের মান আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বিটুমিন বিশেষজ্ঞ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) সহকারী অধ্যাপক ড. নাজমুস সাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউএই থেকে বিটুমিন আমদানি হয়—এ ধরনের গুজব শোনা যায়। মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। মূলত এসব বিটুমিন অন্য একটি দেশ থেকে একটি প্রক্রিয়ায় এনে ইউএই ব্র্যান্ডিং করে। তারপর সেগুলো বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। বিটুমিন এমন একটি পণ্য, যেটিকে কোনোভাবেই কোন দেশ থেকে উৎপাদিত, সেটি স্পষ্ট করা সম্ভব না। ড্রামের গায়ে তো যেকোনো কিছুই লিখে দেওয়া যেতে পারে। লিখে দিলেই যে এটির উৎপাদক ইউএই হয়ে যাবে, তা মনে করার সুযোগ নেই। যদি আমরা একটি বায়োলজিক্যাল ম্যাটেরিয়ালের সোর্স না জানি তার মান আগেই বোঝা মুশকিল।
কিন্তু যথাযথ মনিটরিং না থাকায় রাস্তার সর্বনাশ করা ভেজাল বিটুমিনের আমদানি একটুও কমেনি। বছরে আমদানি হচ্ছে চার লাখ টনের বেশি। শুধু তা-ই নয়, ভেজাল বিটুমিন আমদানির আড়ালে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচারও। কালের কণ্ঠ’র এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে শুধু নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির আড়ালে পাচার হয়ে গেছে অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা। আর এই বিটুমিনে সড়কের ক্ষতি তো অনেক।
fblsk
পরবর্তী মন্তব্যের জন্য আপনার নাম,ইমেইল,ওয়েবসাইট ব্রাউজারে সংরক্ষণ করুণ
সম্পাদকঃ
বিডিবিএল ভবন ( লেভেল - ৮) ১২ কারওয়ান বাজার সি/এ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
কপিরাইট © ২০২৪ পাওয়ার্ড বাই লালসবুজের কথা